রবার্ট কে মার্টন কে? মার্টনের মতে নৈরাজ্যের কারণসমূহ আলোচনা

রবার্ট কে মার্টন কে? মার্টনের মতে নৈরাজ্যের কারণসমূহ আলোচনা

ভূমিকা: "আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক উৎকর্ষ সাধনে যে কজন মনীষী অসামান্য অবদান রেখেছেন, আমেরিকান সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট কে. মার্টন (Robert K. Merton) তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ১৯১০ সালে জন্মগ্রহণ করা এই চিন্তাবিদ মূলত একজন ক্রিয়াবাদী (Functionalist) তাত্ত্বিক হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তিনি বিজ্ঞানের যুক্তির সাথে সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে সমন্বিত করে সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।

মার্টনের সবচেয়ে আলোচিত তত্ত্বগুলোর একটি হলো 'নৈরাজ্য বা এনোমি' (Anomie)। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের এনোমি ধারণাকে মার্টন আরও আধুনিক ও বিস্তৃত রূপ দান করেছেন। তাঁর মতে, নৈরাজ্য কোনো আকস্মিক বিশৃঙ্খলা নয়, বরং সমাজকাঠামোর অসামঞ্জস্যতারই একটি ফল। আজকে আমরা রবার্ট কে. মার্টন কে এবং তাঁর মতে সমাজের নৈরাজ্যের কারণসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করব।"

রবার্ট কে মার্টন কে? মার্টনের মতে নৈরাজ্যের কারণ

রবার্ট কে. মার্টনের পরিচয়:

রবার্ট কে. মার্টন পূর্ব ইউরোপের ফিলাডেলফিয়ার এক ইহুদি শ্রমজীবী পরিবারে ১৯১০ সালের ৪ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় ফিলাডেলফিয়ায়। তিনি ১৯৩১ সালে টেম্প বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এম. ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৩২ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম-এ এবং পরে ১৯৩৬ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি মূলত পিতিরিম সরোকিন এর ছাত্র ছিলেন। যদিও অনেকে মনে করেন যে, তিনি ট্যালকট পারসন্স-এর ছাত্র ছিলেন। মূলত পারসন্স ছিলেন তার একজন পরীক্ষক।

মার্টন ১৯৩৪ সালে হার্ভার্ড এ সমাজবিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা আরম্ভ করেন এবং ১৯৩৬ সালে ইনস্ট্রাক্টর পদে উন্নীত হন। তিনি ১৯৩৬ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে টিউলেনে চলে যান তারপর ১৯৪০ সালে অধ্যাপক এবং ১৯৪১ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটান। ১৯৪১ সালের পর থেকে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা আরম্ভ করেন। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৪৪ সালে সহযোগী অধ্যাপক এবং ১৯৪৭ সালে পূর্ণ অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। মার্টন আমেরিকান সমাজবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৪ সালের পর তিনি নিয়মিত শিক্ষাদান বন্ধ করে দেন। তবে গবেষণাসহ বিভিন্ন কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি অন্তত ২০ টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি লাভ করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে মার্টন দুটো বিয়ে করেছিলেন এবং তার প্রথম স্ত্রীর ঘরে একটি ছেলে এবং দুটো মেয়ে আছে। তার একমাত্র ছেলে রবার্ট সি. মার্টন ১৯৯৭ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৯৭ সালে মার্টন নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে মার্টন মৃত্যুবরণ করেন।

পরিশেষে বলা যায় যে, আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের জগতে রবার্ট কে. মার্টন একজন অন্যতম মার্কিন তাত্ত্বিক। ডঃ এলওয়েলের মন্তব্য অনুসারে, রবার্ট কে. মার্টন নিঃসন্দেহে তার সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী সমাজবিজ্ঞানীদের একজন।

মার্টনের নৈরাজ্যের কারণসমূহ:

মার্টন তাঁর "Social Theory and Social Structure" গ্রন্থে নৈরাজ্যের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর নৈরাজ্যের কারণসমূহ নিম্নরূপ।

১. অপরাধমূলক আচরণ

মার্টনের মতে, সমাজের মানুষের অপরাধমূলক আচরণের জন্যই নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। জিনোমি সমাজকে ধীরে ধীরে পশ্চাৎপদ করে তোলে। সমাজকাঠামোর বিশৃঙ্খলা তখন অধিক গরিমাণে যেড়ে যায়। তিনি বলেন, ডুর্খেইমের নৈরাজ্য শুধু আগ্রহত্যাই নয় বরং অপরাধমূলক আচরণের প্রভাব লক্ষণীয়। স্থান-কাল-পাত্রভেদে যদিও অপরাধমূলক আচরণের হার ভিন্ন হয় তবুও এক্ষেত্রে সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়।

২. প্রত্যাশার লক্ষ্য

সমাজকাঠামো মানুষের প্রত্যাশার লক্ষ্য দ্বারাই পরিচালিত হয়। তাই প্রত্যেক সমাজে কিছু স্বীকৃত প্রত্যাশা থাকে। সফলতা, অর্থ, ক্ষমতা, মর্যাদা যখন ক্ষুন্ন হয় তখন সমাজে নৈরাজ্য বা এনোমি সৃষ্টি হয়। মানুষের প্রত্যাশা পূরণ না হলে বা ব্যাঘাত ঘটলে মানুষের ও সমাজের মধ্যে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এটি সব সমাজেই কম-বেশি হতে পারে।

৩. সাংস্কৃতিক লক্ষ্য

সমাজে এমন কিছু সাংস্কৃতিক লক্ষ্য থাকতে পারে যার সাথে সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ের সম্পর্ক থাকবে না। এ ধরনের সাংস্কৃতিক অবস্থা, যাকে মার্টন বলেছেন, মা লক্ষ্যটির প্রতি এতই গুরুত্ব দেয়া হয় যে ব্যক্তি তখন যেকোনো উপায় অবলম্বন করে, এমনকি সবচেয়ে নিষিদ্ধ উপায়ও। তখনই সমাজে এনোমি সৃষ্টি হয়ে থাকে।

৪. প্রাতিষ্ঠানিক উপায়

মার্টনের' মতে, যখনই সামাজিক লক্ষ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ের মধ্যে বিস্তার ব্যবধান দেখা দেয় তখনই সেখানে নৈরাজ্য দেখা দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক উপায় দুর্বল হলে সমাজকাঠামো এনোমি সৃষ্টি হয়।

৫. সামাজিক পন্থা

সমাজে ব্যক্তির নিকট যখন সামাজিক পন্থা গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি অনুসারে মনে না হয়, তখন সমাজে এনোমি সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে অনেক সময় ব্যক্তি নিজেকে আড়াল বা গুটিয়ে নেয়।

পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজে এনোমি ও বিচ্যুতি সৃষ্টিতে অপরাধমূলক আচরণ, প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন না করা, পশ্চাৎপ্রসারতা প্রভৃতি ভূমিকা পালন করে থাকে।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন