রবার্ট কে. মার্টনের প্রধান প্রধান তাত্ত্বিক অবদানসমূহ পর্যালোচনা কর

রবার্ট কে. মার্টনের প্রধান প্রধান তাত্ত্বিক অবদানসমূহ কী কী? পর্যালোচনা কর

উত্তর: "আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক বিকাশে যে কজন মনীষীর অবদান সর্বজনস্বীকৃত, আমেরিকান সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট কে. মার্টন (Robert K. Merton) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই চিন্তাবিদ বিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। মূলত একজন ক্রিয়াবাদী (Functionalist) তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিত হলেও, তাঁর সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাধারা ছিল গতানুগতিক ধারার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবধর্মী ও গবেষণাযোগ্য।

মার্টনের তত্ত্বগুলো প্রধানত সামাজিক আচরণের উপায় ও উদ্দেশ্যের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। যদিও তিনি ট্যালকট পারসন্সের ক্রিয়াবাদী ধারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, তবে তিনি সেগুলোকে পরিমার্জন ও আধুনিকায়ন করে সমাজবিজ্ঞানে এক নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছেন। আজকে আমরা রবার্ট কে. মার্টনের প্রধান তাত্ত্বিক অবদানসমূহ সংক্ষেপে পর্যালোচনা করার চেষ্টা করব।"

মার্টনের প্রধান প্রধান তাত্ত্বিক অবদান

রবার্ট কে. মার্টনের প্রধান তাত্ত্বিক অবদানসমূহ:

রবার্ট কে মার্টনের উল্লেখযোগ্য তাত্ত্বিক অবদানসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো

১. বিজ্ঞানের সমাজতত্ত্ব

সম্প্রতি বিজ্ঞানের সমাজতত্ত্ব (Sociology of Science) সমাজবিজ্ঞানের একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও এর স্রষ্টা হচ্ছেন আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মার্টন। তাঁর প্রথম প্রকাশনা ছিল Science. Technology and Society in Seventeenth Century England, যা তাঁর পিএইচডি থিসিস ছিল। সমাজবিজ্ঞানের সৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সতেরো শতকের ইংল্যান্ডে বিজ্ঞানের বিকাশ, চর্চা ও প্রেক্ষিত নিয়ে উল্লিখিত গবেষণা করেন। ঐ পুস্তকে তিনি মূলত বিজ্ঞানের সাথে সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তৎকালীন বিজ্ঞানীদের জীবন, রচনাবলি, চিঠিপত্র, দিনলিপি ও স্মৃতিকথার মধ্যে তাদের জীবন দর্শন, মূল্যবোধ এবং বিজ্ঞান আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন। তিনি মূলত অনুসন্ধান করেছিলেন যে, পিউরিটানবাদ বা ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীর প্রটেস্ট্যান্ট বিশুদ্ধতাবাদ, অর্থনীতি, পেশা এবং সমবতন্ত্রের সাথে বিজ্ঞানের বিকাশ কীভাবে সম্পর্কিত ছিল। ওয়েবারের Protestantism এবং পুঁজিবাদের বিকাশের সম্পর্ক বিষয়ক জনপ্রিয় হয়নার কারণে মার্টনের রচনায়ও বিজ্ঞানের সাথে Puritanism এর সম্পর্ক আবিষ্কারের চেষ্টা করেন। যদিও মনে হয় যে, ধর্ম, ধর্ম চেতনা বা ধর্মতত্ত্ব বিজ্ঞান চর্চা বিরোধী তবে মার্টন তাঁর রচনার Protestantism কে তার অনুকূল বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এমনকি ফরাসি দেশে Protestant একাডেমিগুলো Catholic দেরকে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত করেছিলেন। অনুরূপ জার্মানিতেও ধর্মযাজকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান চর্চায় উৎসাহিত করেন। তিনি পরিসংখ্যান নিয়ে প্রমাণ করেন যে, বিজ্ঞানীদের মধ্যে Protestant বেশি।

২. মধ্যম প্রকৃতির তত্ত্ব

মধ্যম পরিসর তত্ত্বের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে মার্টন বলেছেন, "দৈনন্দিন গবেষণা করতে গিয়ে যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কল্পনাসমূহ আবির্ভূত হয় এবং একক অত্ত্ব বা সামাজিক আচরণ, সামাজিক সংজ্ঞা ও সমাজ পরিবর্তনকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হয় তার মাঝামাঝি যেসব তত্ত্ব অবস্থান করে, তাদেরকে মধ্যম পরিসর তত্ত্ব (Middle range theory) বলা হয়।" মধ্যম পরিসর তত্ত্ব বিনির্মাণকে মার্টন সবসময় গুরুত্বারোপ করেছেন বাস্তব প্রয়োজনে ও সমাজবিজ্ঞানের ভবিষ্যতের কথা মনে রেখে। তাছাড়া মার্টনের মতে, "মধ্যম প্রকৃতির" তত্ত্ব নিম্নের উল্লিখিত উপায়ে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

(i) মধ্যম প্রকৃতির তত্ত্ব ক্ষুদ্র ও বৃহৎ প্রকৃতির তত্ত্বের মাঝামাঝি প্রকৃতির তত্ত্ব।

(ii) ক্ষুদ্র প্রকৃতির তত্ত্ব বলতে এখানে সচরাচর লক্ষণীয় কামিক হাইপোথিসিস বুঝায়, যা দৈনন্দিন গবেষণার দ্বারা প্রচুর পরিমাণে আবির্ভূত হচ্ছে।

(iii) বৃহৎ প্রকৃতির তত্ত্ব বলতে এখানে বুঝানো হয়েছে সেসব সর্ববিষয়গ্রাসী প্রচেষ্টা, যা সামাজিক আচরণ, সামাজিক সংগঠন ও সামাজিক পরিবর্তনের সব ধরনের পর্যবেক্ষণকৃত সাদৃশ্য বিষয়ের উপর ভিত্তি ও একত্রীকরণের উপর প্রতিষ্ঠিত।

(iv) সব সমাজভিত্তিক তত্ত্ব প্রধানত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাভিত্তিক অনুসন্ধানে সহায়তা করে।

(v) সব সমাজভিত্তিক বৃহৎ প্রকৃতির তত্ত্বাগুলো দার্শনিক ব্যাখ্যার মতোই উপযোগিতাহীন ও সেঞ্চয় পরিত্যাজ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়।

মধ্যম পরিসর তত্ত্বের উদ্দেশ্য

মার্টন প্রদত্ত মধ্যম পরিসর তত্ত্বের কৃতকগুলো উদ্দেশ্য রয়েছে, যথা-

(i) মধ্যম পরিসর তত্ত্ব বাস্তব অনুসন্ধানকে দিক নির্দেশনা প্রদান করে। Prawns বাস্তবতাহকে তেমন গুরুত্বারোপ করেন নি।

(ii) মধ্যম পরিসর তত্ত্ব সামাজিক ব্যবস্থার একটি মধ্যবর্তী সাধারুণ তত্ত্ব, যা বিশেষ শ্রেণির সামাজিক আচরণ, সংগঠন এবং পরিবর্তন থেকে প্রাপ্ত কিছু বিশেষ ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে।

৩. বিচ্যুতি আচরণ তত্ত্ব

মার্টিন তাঁর বিচ্যুত অল্প উত্তরণে যে ব্যাখ্যামূলক কারণসমূহ ব্যবহার করেছেন তা ক্রিয়াবালী তত্ত্বের বিশ্লেষণে প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন-

(i) সংস্কৃতিগত উদ্দেশ্য: সংস্কৃতিগত উদ্দেশ্য কমবেশি বৈধ এবং গঠনতান্ত্রিক কাঠামোর ধারণাকে নির্দেশ করে। যেমন সমাজের মধ্যে সফলতা, অর্থবিয় প্রতিপত্তির মধ্যে স্বীকৃত প্রত্যাশা।

(ii) প্রাতিষ্ঠানিক উপায়: অর্থবিত্ত ও সফলতা পাওয়ার জন্য গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। এগুলো খুব বেশি কার্যকর উপায় নয়, কিন্তু সামাজিকভাবে স্বীকৃত এবং নিয়ন্ত্রিত।

Anomie তখনই ঘটে যখন Cultural goals এবং Institutional means এর মধ্যে বিচ্ছিন্নাতা দেখা দেয় এবং সমাজের বিভিন্ন সদস্যরা ঐ কাঠামোর সাথে সংগতি রেখে ক্রিয়া করে।

Merton তাঁর বিশ্লেষণ আমেরিকান সমাজে প্রয়োগ করেছেন। যেখানে প্রত্যেকটি মানুষের মিলেনিয়াম হওয়ার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু এ মিলেনিয়াম হওয়ার রাস্তা বাস্তবে সবার জন্য সমান নয়। Merton বলেছেন, "আমেরিকান সমাজে মিলেনিয়াম হওয়ার যে সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা, তা সত্ত্বেও এ আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এখানে anomie তৈরি হচ্ছে।

অভিযোজন

মার্টন মূলত ডুরখেইমের Anomie ধারণার উপর ভিতি করে তাঁর বক্তব্য বিশ্লেষণ করেন। ব্যক্তি যে সমাজে খাপ খাচ্ছে তার একটা বিশেষ প্রকরণ হচ্ছে বিচ্যুতি। অন্যদিকে anomie হচ্ছে সংস্কৃতি এবং কাঠামো এর সমন্বয়হীনতা এর ফলপ্রতি এ বিচ্যুতির সমন্বয়হীনতার প্রকৃতির সাথে জড়িত। এ প্রসঙ্গে Merton কতকগুলো ক্রিয়াবাদী ধারণা দাঁড় করিয়েছেন।

১। একটি সমাজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এককসমূহের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

২। এ পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই একটি সমাজের ভারসাম্য সৃষ্টি হয়।

৩। ভারসাম্যহীনতা বিচ্যুত আচরণের সৃষ্টি করে।

৪। ভারসাম্যহীনতার প্রকৃতি বিচ্যুতি আচরণের বরুন নির্ণয় করে।

৪. কাঠামোগত ক্রিয়াবাদ

সমাজতত্ত্বের ক্রিয়াবাদের প্রকৃত গুরুত্বকে উপলব্ধি করেই মার্টন তাঁর পূর্ববর্তী ক্রিয়াবাসীদের তত্ত্বকে সংশোধন ও পরিবর্ধন করে একটি সুসংগঠিত কাঠামোগর ক্রিয়াবাদী তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। কেননা, তিনি বিশ্বাস করতেন ক্রিয়াবাদী মতবাদ একাধারে সর্বাধিক সম্ভাবনাময় এবং সর্বশেষ সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা। আর এই গুরুত্বের উপলব্ধি থেকেই মার্টন পূর্ববর্তী ক্রিয়াবাদী চিন্তাধারাকে আলোচনা, পর্যালোচনা করে অধিকতর ও বাস্তবমুখী একটি দৃষ্টিকোণকে সমাজবিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত ও তত্ত্বগত বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হন। তাঁর মতে, ক্রিয়াবাদী দৃষ্টিগুলি হলো সমাজব্যবস্থার সামগ্রিক বা আংশিক ধরন। প্রকৃতি, প্রত্যয়, অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব তথ্য সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রয়োজনসমূহের উপর উক্ত ধরনসমূহের বিভিন্নরকম ফলশ্রুতি এবং এগুলো কীভাবে একে অপরের সাথে ক্রিয়া করার মাধ্যমে পারস্পরিক ভউপযোগিতা পূরণে সক্ষম হয় তাঁরই প্রক্রিয়া।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের জগতে রবার্ট কে. মার্টন একজন অন্যতম মার্কিন তাত্ত্বিক। এ প্রসঙ্গে Dr. Elwell's মন্তব্য করেছেন, Robert K. ব Merton is unarguably one of the most influential sociologists of his time. তাঁর দীর্ঘ জীবদ্দশায় সমাজবিজ্ঞানের উন্নতি ও ক্রমবিকাশে বহু বিখ্যাত তত্ত্ব রচনা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো বিজ্ঞানের সমাজতত্ত্ব, ক্রিয়াবাদতত্ত্ব, মধ্যম প্রকৃতির তত্ত্ব বিচ্যুত তত্ত্ব উল্লেখযোগ্য।


shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন