রবার্ট কে. মার্টনের বিচ্যুতি তত্ত্বটি পর্যালোচনা কর

রবার্ট কে. মার্টনের বিচ্যুতি তত্ত্ব পর্যালোচনা

ভূমিকা: "বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্কিন সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট কে. মার্টন সমকালীন সমাজচিন্তায় এক প্রবাদপ্রতিম নাম। তিনি মূলত একজন ক্রিয়াবাদী তাত্ত্বিক হিসেবে সুপরিচিত হলেও, প্রচলিত ক্রিয়াবাদকে পরিমার্জন ও সংশোধনের মাধ্যমে সমাজবিজ্ঞানে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। মার্টনের তত্ত্বগুলোর প্রধান লক্ষ্য ছিল সমাজকাঠামোর স্থিতিশীলতা এবং এর বিচ্যুতিগুলো বিশ্লেষণ করা।

তাঁর বহুল আলোচিত ও কালজয়ী তত্ত্ব হলো 'বিচ্যুতি তত্ত্ব' (Deviance Theory), যা তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ 'Social Structure and Anomie'-তে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই তত্ত্বে তিনি দেখিয়েছেন যে, অপরাধ বা বিচ্যুতি কেবল ব্যক্তির দোষ নয়, বরং সমাজকাঠামোর চাপের ফলেই মানুষ বিচ্যুত আচরণে লিপ্ত হয়। আজ মার্টনের বিচ্যুতি তত্ত্বের মূল কাঠামো এবং এর বিভিন্ন ধরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।"

মার্টনের বিচ্যুতি তত্ত্বটি পর্যালোচনা

মার্টনের বিচ্যুতি তত্ত্ব

মার্টন তাঁর বিখ্যাত 'Social Structure and Anomic'- গ্রন্থে বিচ্যুত আচরণ তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি শুধু ডুরখেইমের নৈরাজ্য (Anomic) ধারণা দ্বারা Suicide কে ব্যাখ্যা করেননি। এর মাধ্যমে তিনি সমাজের বিভিন্ন বিচ্যুতিমূলক আচরণের ধরন এবং বিপ্লবী পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করেন। তিনি এ Anomic ধারণাকে অধিক স্বাধীন Term হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ডুরখেইম Anomic বলতে সমাজ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা বা রীতিনীতি কাঠামো ভেঙে যাওয়াকে বুঝিয়েছেন। Marton এর সংজ্ঞার সাথে Durkheim এর সংজ্ঞার কিছুটা পার্থক্য আছে। তাঁর মতে, Anomic হলো Discontinenty between cultural goals and institutionalized means."

মার্টন তাঁর বিচ্যুত তত্ত্ব উত্তরণে যে ব্যাখ্যামূলক কারণসমূহ ব্যবহার করেছেন তা ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের বিশ্লেষণে প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন- (i) সংস্কৃতিগত উদ্দেশ্য (ii) প্রাতিষ্ঠানিক উপায়।

(i) সংস্কৃতিগত উদ্দেশ্য: সংস্কৃতিগত উদ্দেশ্য কমবেশি বৈধ এবং গঠনতান্ত্রিক কাঠামোর ধারণাকে নির্দেশ করে। যেমন- সমাজের মধ্যে সফলতা, অর্থবিত্ত, প্রতিপত্তির মধ্যে স্বীকৃতি প্রত্যাশা।

(ii) প্রাতিষ্ঠানিক উপায়: অর্থবিত্ত, সফলতা পাওয়ার জন্য গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি এগুলো খুব বেশি কার্যকর উপায় তা নয়, কিন্তু সামাজিকভাবে স্বীকৃত এবং নিয়ন্ত্রিত।

Anomic তখনই ঘটে যখন Cultural goals এবং Institutional means-এর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয় এবং সমাজের বিভিন্ন সদস্যরা ঐ কাঠামোর সাথে সংগতি রেখে ক্রিয়া করে। মার্টন তাঁর বিশ্লেষণ আমেরিকান সমাজে প্রয়োগ করেছেন, যেখানে প্রত্যেকটি মানুষের মিলেনিয়াম হওয়ায় সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এ মিলেনিয়াম হওয়ার রাস্তা বাড়বে সবার জন্য সমান নয়। মার্টন বলেছেন, "আমেরিকান সমাজে মিলেনিয়াম হওয়ার যে সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা, তা সত্ত্বেও এ অকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এখানে Anomic তৈরি হচ্ছে।"

অভিযোজন (Adaptation):

মার্টন Means এবং Goals এর সম্পর্কের ভিন্নতার উপর গুরুত্ব দিয়ে তাঁর তত্ত্বে পাঁচ প্রকার Adaptation বা অভিযোজনের কথা বলেন। যাদের প্রত্যেকেই সমাজের নিজস্ব বা স্বতন্ত্র ভূমিকা পালন করে। মার্টন বর্ণিত এই পাঁচ প্রকার Adaptation এবং এদের সামাজিক ভূমিকা নিম্নরূপ:

১. Conformity (সামঞ্জস্য)

কোনো সমাজব্যবস্থায় সাংস্কৃতিক লক্ষ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকার ফলে সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। যেহেতু এখানে নৈরাজ্য সম্পর্কে আলোচনা হবে, সেজন্য ব্যক্তি অন্যান্য অবস্থায় কীভাবে খাপ খাওয়ায় সে সম্পর্কে আলোচনা করা।

২. Innvation (উদ্ভাবন)

এ ধরনের অভিযোজন মোটামুটি পরিবর্তনের নির্দেশক। এ অবস্থায় Cultural goals কে মান্য করা হয়, কিন্তু Institutional means অমান্য করা হয়। এক্ষেত্রে মার্টন বলেন, প্রথমত ব্যক্তির পারিবারিক সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া অবৈধ উপায় অবলম্বনের প্রত্যাশাকে উদ্দীপ্ত এবং ব্যক্তিকে সম্ভাব্য বৈধ পথ খোঁজার মনস্তাত্ত্বিক মূল্য প্রদানে অসহিষ্ণু করে।

৩. Ritualism (প্রথানিষ্ঠতা)

যদি কোনো অবস্থায় আর্থিক সাফল্যের বিষয়টি বা সামাজিক গতিশীলতাকে প্রাধান্য দেয়া না হয় এবং কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতাকে গুরুত্ব দেয়া হয়, তখন ব্যক্তি যেভাবে খাপ খাওয়ায় তার অবস্থাকে মার্টিন প্রথানিষ্ঠতা বলে মনে করেছেন। এ ধরনের অবস্থাকে গ্রহণ করার জন্য সে ধরনের সমাজই উৎসাহিত করে, যেখানে অর্জিত মর্যাদার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়। তিনি উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন যে, অত্যন্ত সতর্ক আমলারা সাধারণভাবে কাগজপত্রে সকল নিয়ম। কানুন মেনে চলে থাকেন এবং এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রতি নিম্ন মধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকেন।

8. Retreatism (পশ্চাদপসরণ)

যেখানে ব্যক্তি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য হয় অর্থাৎ সাংস্কৃতিক বা সামাজিক লক্ষ্যে এবং প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে এ দুটোকে প্রত্যাখ্যান করে। যেমন- মানসিক বিকারগ্রস্ত, সমাজচ্যুত, ভবঘুরে, মদ্যপ এবং মাদকাসক্ত। এ ধরনের অবস্থা তখনই সৃষ্টি হয় যখন ব্যক্তি সামাজিক লক্ষ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক উপায় এ দুটোর মধ্যে সমন্বয় করেও কোনো আশাপ্রদ ফল পায় না।

৫. Rebellion (বিদ্রোহ):

যখন ব্যক্তি দেখে যে, বিদ্যমান সমাজ কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক উপায় স্বীকৃত সামাজিক লক্ষ্য অর্জনে অপর্যাপ্ত বা অকার্যকর, তখনই বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়। সংগঠিত রাজনৈতিক কর্ম, আন্দোলন এবং বিপ্লব ইত্যাদি এ ধরনের উদাহরণের পর্যায়ে পড়ে।

সমালোচনা:

মার্টনের বিচ্যুতি তত্ত্বটি নানাভাবে সমালোচিত হয়েছে, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

১। এটি' খুব বিমূর্ত এবং সংক্ষিপ্ত। অনেক তাত্ত্বিক মনে করেছেন, মার্টন তার অভিযোজনের ব্যাখ্যাকে খুব যৌক্তিকভাবে শ্রেণিকরণ করেন নি।

২। Deviance কে ব্যক্তির কার্য হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং এ ব্যক্তির ব্যর্থতাকে দলের ব্যর্থতা হিসেবে দেখানো হয়েছে।

৩। যে বিষয়গুলো বস্তুগত সাফল্য নিয়ে আসে, সে বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রশ্ন করতে বা সমালোচনা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

৪। মার্টন বিদ্রোহকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সেটা কৃত্রিম।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মার্টনের বিচ্যুত তত্ত্ব তাঁর ক্রিয়াবাদী সমাজতাত্ত্বিক আলোচনার ভিত্তিভূমি হলেও প্রকৃতপক্ষে তাঁর তত্ত্বটির সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ার মতো। তিনি সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে শুধু মার্টন সমাজের মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করায় তাঁর তত্ত্বের প্রভাব সমাজবিজ্ঞানে অনেকটাই কম। তাছাড়া এটি অনেক জটিল প্রকৃতির বলেও তা বুঝা অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু তাই বলে তাঁর তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানে একেবারে মূল্যহীন তা বলা চলে না।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন