মার্টনের কাঠামোগত ক্রিয়াবাদের মৌলিক অনুকল্প বা ক্রিয়াবাদের সংকরায়ন পর্যালোচনা
ভূমিকা: "আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাধারার ইতিহাসে আমেরিকান সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট কে. মার্টন এক অনন্য নাম। তিনি বিজ্ঞানের গভীরতা দিয়ে সমাজ, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। মার্টনের সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বসমূহের মধ্যে কাঠামোগত ক্রিয়াবাদ (Structural Functionalism)-কে তাঁর মেধা ও পরিপক্ব চিন্তার শ্রেষ্ঠ ফসল হিসেবে গণ্য করা হয়।
যদিও তিনি তাঁর শিক্ষক ও পূর্বসূরী ট্যালকট পারসন্স-এর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন, তবে তিনি অন্ধভাবে তাঁকে অনুসরণ করেননি। বরং পারসন্সের বিমূর্ত তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা দূর করে তিনি ক্রিয়াবাদকে আরও বাস্তবসম্মত ও গবেষণাযোগ্য করে তোলেন। মার্টনের কাঠামোগত ক্রিয়াবাদের মৌলিক অনুকল্প এবং তাঁর উদ্ভাবিত ক্রিয়াবাদের সংকরায়ন বা পরিমার্জন নিয়ে আজ বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করব।"
মার্টনের ক্রিয়াবাদ তত্ত্ব
মার্টন তাঁর পূর্ববর্তী সমাজবিজ্ঞানী ও নৃ-বিজ্ঞানী যথা: ডুরখেইম, ম্যালিনস্কি, র্যাডক্লিফ ব্রাউন এবং ট্যালকট পারসন্সের ক্রিয়াবাদী বিশ্লেষণের ধরন ও ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়ে আলোচনা করেন। সে আলোচনা থেকে তিনি নিজে সমাজের ক্রিয়াবাদী একটি তত্ত্ব প্রদানের চেষ্টা করেছেন।
মার্টিন ক্রিয়া শব্দের পাঁচ ধরনের ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন, যথা।
১। ক্রিয়া হচ্ছে জনসমাগম বা অনুষ্ঠান।
২। ক্রিয়া হচ্ছে পেশা।
৩। ক্রিয়া হচ্ছে এমন ধরনের কাজ যা কোনো মর্যাদা গ্রান্তিকে বেন্দ্র করে হয়। যেমন- একজন অফিসারের পেশা উপলক্ষে।
৪। ক্রিয়া হচ্ছে অংকের কাজ।
৫। ক্রিয়া হচ্ছে জৈবিক বা সামাজিক প্রক্রিয়া, যা সিস্টেমকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
উল্লিখিত ৫টি ব্যবহারের মধ্যে মার্টিন তাঁর রচনাবলিতে সর্বশেষ ব্যবহারটির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মার্টনের ক্রিয়াবাদের বৈশিষ্ট্য
মার্টনের মতে, প্রচলিত ক্রিয়াবাদের তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যথা:- ১। সমাজব্যবস্থার ক্রিয়াগত ঐক্য। ২। সামাজিক উপাদানসমূহের ক্রিয়াগত বিশ্বজনীনতা। ৩। সমাজব্যবস্থায় ক্রিয়াগত উপাদানসমূহের অপরিহার্যতা। নিম্নে সেসব সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করা হলো।
১। সমাজব্যবস্থার ক্রিয়াগত ঐক্য
মার্টন কোনো সমাজব্যবস্থাকে টিকে থাকার জন্য ক্রিয়াগত ঐক্যের কথা উল্লেখ করেন। তাই ঐ সমাজের ক্রিয়াগত ঐক্য কতটুকু রয়েছে তা জানা এবং গবেষণার জন্য গুরুত্বারোপ করেন। সুতরাং যেসব বিষয়গুলো জানা দরকার তা হচ্ছে।
(ক) বিভিন্ন ব্যবস্থায় ক্রিয়াগত ঐক্যের মাত্রা কী রূপ?
(খ) কত ধরনের ক্রিয়াগত ঐক্যের রূপকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব?
(গ) একটি ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশের ভেতর এই ক্রিয়াগত ঐক্যের আলোচনা উল্লিখিত বিষয় ছাড়াও সামাজিক দল বা দলভুক্ত ব্যক্তিদের উপর সামাজিক সাংস্কৃতিক উপাদান যেমন- প্রমা, বিশ্বাস, অনুষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির প্রভাব বিশ্লেষণকে উপেক্ষা না করা। বাস্তবে পুরো সমাজব্যরস্থা বা এর যেকোনো অংশের ক্রিয়াগত বিশ্লেষণে ক্রিয়াগত ঐক্যের দিক না দেখে। বরং বিভিন্ন অংশের ভেতর এর মাত্রা, আকার ও ধরন। পরীক্ষা করা দরকার এবং দেখা দরকার কীভাবে বিভিন্ন ধরনের সমাজ সংগঠন সৃষ্টি হয়েছে রক্ষিত হয়েছে এবং পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ এখানে শুধু ক্রিয়াগত আলোচনাই যথেষ্ট নয়; বরং ব্যবস্থার ভেতর বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর আন্তঃক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
২। সামাজিক উপাদানসমূহের ক্রিয়াগত বিশ্বজনীনতা
প্রচলিত ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের আরেকটি ত্রুটি হলো এই যে, তা মনে করে যে, সামাজের প্রতিটি উপাদান সমাজব্যবস্থার ক্রিয়াগত ঐক্য সাধনে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু মার্টন মনে করেন যে, (ক) উপাদানসমূহ অনেক সময় ইতিবাচকভাবে ক্রিয়াশীল নয়। এমনকি কখনো কখনো নেতিবাচক ভূমিকাও থেকে থাকে। (খ) কিছু কিছু উপাদানের ভূমিকা ব্যক্ত হতে পারে। আবার কিছু সুপ্ত হতে পারে। উপাদানের ভূমিকা ইতিবাচক বা নেতিবাচক, যাই হোক না কেন। তাই মার্টন সামাজিক উপাদানকে ক্রিয়ার ঐক্যের জন্য উদ্দীপক না বলে তাকে ব্যক্ত বা সুপ্ত, ইতিবাচক বা নেতিবাচক, ক্রিয়াশীল বা অক্রিয়াশীল, এভাবে বিশ্লেষণ করার তাগিদ দেন। মূলকথা তিনি ফলাফলের চূড়ান্ত যাচাইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
৩। সমাজব্যবস্থায় ক্রিয়াগত উপাদানসমূহের অপরিহার্যতা
ক্রিয়াগত অপরিহার্যতার কথা আলোচনা করতে গিয়ে মার্টন দুটো বিষয় উপস্থাপন করেন। যথা: (ক) সত্যিই কি সমাজব্যবস্থার ক্রিয়াগত প্রয়োজন বা পূর্বশর্ত আছে, যা পূরণ করা দরকার? (খ) সত্যিই কি কতক ক্রিয়া সম্পাদনের জন্য অপরিহার্যভাবে কিছু কাঠামোর অস্তিত্বমান?
প্রথমটির ব্যাপারে মার্টনের মতামত হলো যে, কিছু ক্রিয়াগত প্রয়োজন আছে, মাকে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে উপলব্ধি করতে হবে। দ্বিতীয় প্রশ্নটির ব্যাপারে মার্টনের ব্যক্তব্য হলো যে শুধু কাঠামোই ক্রিয়াগত প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না। তিনি মনে করেন যে, বিকল্প কাঠামো অস্তিত্বমান থাকতে পারে যা একই প্রয়োজন একইভাবে করে।
ক্রিয়াবাদের শ্রেণিবিভাগ
মার্টন তাঁর ক্রিয়াবাদী হয়ে ক্রিয়াবাদের দু'টি শ্রেণির কথা বলেছেন। যথা- (ক) ব্যক্ত ক্রিয়া ও (খ) সুপ্ত ক্রিয়া।
(ক) ব্যক্ত ক্রিয়া:
মার্টন ব্যক্ত ক্রিয়া সম্পর্কে বলেছেন, Manifiest functions are objective consequences for the system which are intended and recognized by the relevant participants অর্থাৎ, ব্যক্ত ক্রিয়া হচ্ছে যে ফলশ্রতি যা অংশগ্রহণকারীর চেয়ে থাকে বা স্বীকৃতি দেয় কিংবা বলা যায় যে যার প্রতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বীকৃতি থাকবে এবং তা বঞ্চিত হরে।
(খ) সুপ্ত ক্রিয়া:
মার্টনের মতে, Actor যখন তার কাজের ব্যাপারে সচেতন না থেকেও কিছু অর্জন করছে বা তার ফলাফলের ব্যাপারে Objectively observe করতে পারে তখন তাকে সুপ্ত ক্রিয়া বা Latent function বলে।
সমালোচনা:
রবার্ট কে. মার্টনের ক্রিয়াবাদকে নিম্নোক্তভাবে সমালোচনা করা হয়।
প্রথমত, মার্টন তার তত্ত্বে একটি উপাদানকে গ্রহণ করে তাঁর ক্রিয়াগত ও অপ্রক্রিয়াগত দিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকৃষ ক্রিয়াগত মূল্য নির্ধারণের চেষ্টা করতে বলেছেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁর লেখনীর মধ্যেই য্যাপারটি সেভাবে ঘটে নি।
দ্বিতীয়ত, মার্টনের এ তত্ত্বের মৌলিকত্ব নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, এটা মার্টনের মৌলিক আবিষ্কার নয়, বরং তার পূর্বেও তাত্ত্বিকদের মধ্যে এ ধরনের প্রয়াস লক্ষ করা গেছে।
তৃতীয়ত, মার্টিনের Functionalism তত্ত্ব ব্রাউন, পারসপ ডুরখেইম প্রমুখ তাত্ত্বিকদের তত্ত্বের কিছুটা মাত্রা সংযোজন মাত্র।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিক যতগুলো তত্ত্ব বা মতবাণ প্রদান করেন Functionalism তার মধ্যে অন্যতম। তিনি এ কাট্ট Function -কে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করেন। পরিশোষ যদিও জটিল প্রকৃতির, বিমূর্তায়ন, অস্পষ্ট, মৌলিকত্ববিহীন প্রভৃতিভাবে এ তত্ত্বটির যথেষ্ট সমালোচনা রয়েছে তথাপিও তাঁর তত্ত্বটি যথাযথ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজবিজ্ঞানের ক্রমবিকাশে তাৎপর্যপূর্ণভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।
