হার্বার্ট মার্কুইস কে ছিলেন? মার্কুইস বর্ণিত সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যসমূহ লিখ

হারবার্ট মার্কুইসের পরিচয়? মার্কুইস বর্ণিত সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যসমূহ

ভূমিকা: "বিংশ শতাব্দীর একজন প্রভাবশালী জার্মান-আমেরিকান দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী এবং প্রখ্যাত রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হলেন হারবার্ট মার্কুইস (Herbert Marcuse)। তিনি বিশ্ববিখ্যাত 'ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল অব ক্রিটিক্যাল থিওরি'-এর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সদস্য এবং একজন কট্টর পুঁজিবাদ বিরোধী চিন্তাবিদ হিসেবে সমাদৃত। জার্মানির এই র‍্যাডিকেল ভাবুক নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে নির্বাসিত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মার্কিনি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসেন।

মার্কুইস তাঁর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বিশেষ করে আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের সংস্কৃতিকে গভীর সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সংস্কৃতি মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আজ আমরা হারবার্ট মার্কুইসের পরিচয় এবং তাঁর বর্ণিত সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিয়ে আলোচনা করব।"

হার্বার্ট মার্কুইস কে? মার্কুইস বর্ণিত সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য

হারবার্ট মার্কুসের জীবনী:

হার্বার্ট মার্কুস ১৮৯৮ সালের ১৯ জুলাই জার্মানির বার্লিনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কার্ল মার্কুইস এবং মাতার নাম গার্টভেড ক্রেসলস্কি তিনি ইহুদি পরিবারের সন্তান ছিলেন। হার্বার্ট মার্কুইস বার্লিনের ফ্রেডরিখ উইলহেম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন এবং পরবর্তীতে ফ্রেইবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ফ্রাঙ্কফুর্ট-ভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন , যা পরে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল নামে পরিচিত লাভ করে। তিনি সোফি ওয়ার্থেইম, ইঞ্জ নিউম্যান ও এরিকা শেরোভার নামের তিনজন মহিলাকে বিয়ে করেন। ১৯১৬ সালে তিনি জার্মান সৈন্যবাহিনীতে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে সৈনিক কাউন্সিলের সদস্য হন যা ব্যর্থ সমাজতান্ত্রিক স্পার্টাসিস্ট বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিল। ১৯৬০ এর শেষের দিকে এবং ১৯৭০ এর দিকে তিনি একজন অন্যতম বামপন্থি তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এ সময় তিনি জার্মানি, ফ্রান্স এবং আমেরিকার ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত মার্কুইস US সরকারের অধীনে কাজ করেন এবং সেখানে 'Soviet Marxism: A Critical Alalysis' গ্রন্থ প্রণয়নে সহায়তা করেন। মার্কুইস ১৯৫২ সালে শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি ১৯৩৪-১৯৪২ সাল পর্যন্ত কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি এবং Harvard ইউনিভার্সিটি -তে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হিসেবে শিক্ষকতা করেন। এরূপ তিনি ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত Brandeis University-তে কাজ করেন। শেষ পর্যায়ে তিনি ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ডিয়াগোতে অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এই University তে কাজ করার সময় তিনি তার সবচেয়ে বিখ্যাত ওয়ান-ডাইমেনশনাল ম্যান (১৯৬৪) রচনা করেন। মার্কুইস তার কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে বামপন্থি নানান আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। ছাত্র আন্দোলনে বিভিন্ন ভূমিকা পালন এবং তাদের আন্দোলনের পক্ষে কথা বলার জন্য তাকে আমেরিকান নতুন বামপস্থিদের জনক বলে আখ্যায়িত করা হয়। হার্বার্ট মার্কুইস ১৯৭৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

উল্লেখযোগ্য প্রন্থ ও কর্ম:

হার্বার্ট মার্কুইস তাঁর কর্মজীবনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো হলো Fros and Civilization (1955), An Essay on Liberation (1969), Reason and Revolution (1941). The Aesthetic Dimension (1977), Counter Revolution and Revolution (1972), Heideggerian Marxism, Soviet Marxism A Critical Analysis (1958), A Study of Authority, Marxism, Revolution and Utopia। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ One Dimensional Man' গ্রন্থে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সমালোচনা করেন। এবং এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর রচিত আরেকটি বিখ্যাত গ্রন্থ হলো 'দ্য অ্যাসথেটিক ডাইমেনশন"

উপরিউক্ত আলোচনা শেষে একথা বলা যায় যে, হার্বার্ট মার্কুইস একজন অন্যতম বামপন্থি তাত্ত্বিক ও দার্শনিক, আধুনিক প্রযুক্তি, পুঁজিবাদ, একমাত্রিক মানুষ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, গণতন্ত্র প্রভৃতি বিষয়সমূহ নিয়ে তিনি যে আলোচনা ও সমালোচনা করেছেন তা সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনায় একটা বিশেষ দিকের উন্মোচন করেছে।

মার্কুইস বর্ণিত সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যসমূহ

হারবার্ট মার্কুইস তাঁর দার্শনিক চিন্তায় কার্ল মার্কস ও সিগমুন্ড ফ্রয়েড উভয়ের তত্ত্বকে একত্রিত করেন। তিনি আধুনিক পুঁজিবাদ, আধুনিক প্রযুক্তি, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এবং বিনোদনমূলক সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, এসবের ফলে সমাজে এক নতুন ধরনের পরাধীনতা ও শোষণের জন্ম হয়। মার্কুইস সংস্কৃতিকে প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন উচ্চতর সংস্কৃতি ও নিম্ন সংস্কৃতি।

ক. উচ্চতর সংস্কৃতি

উচ্চতর সংস্কৃতি প্রযুক্তির সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত নয় এবং এটি অভিজাত সংস্কৃতি নামেও পরিচিত। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-

১. অভিজাত চরিত্র

উচ্চতর সংস্কৃতির ধারকরা সাধারণত সমাজের সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত শ্রেণিভুক্ত। সাধারণ বা নিম্ন সংস্কৃতির মানুষের তুলনায় এদের চিন্তা-চেতনা ও সচেতনতার পার্থক্য স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়।

২. প্রাক-প্রযুক্তিনির্ভরতা

এই সংস্কৃতি প্রযুক্তিগত বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ নয়। প্রযুক্তি মানুষের আচার-আচরণ ও মূল্যবোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এখানে নিয়ন্ত্রণহীন ও মুক্ত সৃজনশীল শক্তির প্রতি আস্থা রাখা হয়।

৩. অতীন্দ্রিয় ও নান্দনিক গুণ

উচ্চতর সংস্কৃতি প্রত্যক্ষ ভোগের পরিবর্তে নান্দনিক ও অতীন্দ্রিয় আনন্দের উপর গুরুত্ব দেয়। যেমন—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও দর্শন।

৪. অ-যন্ত্রগত বা অ-উপকরণমূলক চরিত্র

এই সংস্কৃতিতে অর্থ ও মুনাফার গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম। শিল্প, সাহিত্য ও চিন্তাধারা এখানে কোনো ব্যবহারিক লাভের জন্য নয়, বরং মানবিক ও আত্মিক উৎকর্ষের জন্য চর্চা করা হয়।

৫. বহুমাত্রিকতা

উচ্চতর সংস্কৃতি বহু ধরনের চিন্তা-চেতনা ও কার্যকলাপের কেন্দ্রস্থল। এখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা বজায় থাকে এবং কারো স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করা হয় না।

খ. নিম্ন সংস্কৃতি

নিম্ন সংস্কৃতি প্রযুক্তিগত যৌক্তিকতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত এবং উদ্বৃত্ত উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-

১. প্রযুক্তিনির্ভরতা

নিম্ন সংস্কৃতি প্রযুক্তির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। প্রযুক্তিগত যৌক্তিকতাকে অনুসরণ ও প্রতিপালন করাই এই সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য।

২. লাভমুখী চরিত্র

মুনাফা অর্জনই এই সংস্কৃতির প্রধান উদ্দেশ্য। যেকোনো উপায়ে লাভ অর্জনের প্রবণতা এখানে প্রবল, ফলে মানুষের জীবনযাপন হয়ে ওঠে যান্ত্রিক।

৩. যন্ত্রসঙ্গী বা যান্ত্রিকতা

এই সংস্কৃতি সম্পূর্ণভাবে যান্ত্রিক। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রকাশ ও বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

৪. একমাত্রিকতা

একমুখী চিন্তাধারা নিম্ন সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এর ফলে প্রকৃত চেতনাবোধ ও স্বাধীনতাবোধ বিকশিত হয় না।

৫. বুর্জোয়া সংস্কৃতি

মার্কুইস এই সংস্কৃতিকে বুর্জোয়া সংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এখানে পুঁজিবাদী চিন্তা-চেতনার আধিপত্য লক্ষ করা যায় এবং এটিকে তিনি পুঁজিবাদের বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে দেখেছেন।

৬. উচ্চতর সংস্কৃতির বিরোধী উপাদান বিলোপ

নিম্ন সংস্কৃতি উচ্চতর সংস্কৃতির ভিন্নধর্মী, সমালোচনামূলক ও অতিক্রান্ত উপাদানগুলোকে ধীরে ধীরে বিলোপ করে দেয়।

উপসংহার: উপরের আলোচনা থেকে বলা যায় যে, হারবার্ট মার্কুস একজন উত্তরাধুনিক দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী, যিনি আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ ও উৎপাদন ব্যবস্থায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ উপভোগের ধরন ও মাধ্যমকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি সংস্কৃতিকে উন্নয়ন ও উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সঙ্গে সংযুক্ত করে আধুনিক সমাজের পরাধীনতার রূপ উন্মোচন করেছেন।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন