রবার্ট কে মার্টনের দুষ্ক্রিয়া বা অপক্রিয়া কী? ব্যক্ত ক্রিয়া ও সুপ্ত ক্রিয়া কী?

মার্টনের দুষ্ক্রিয়া বা অপক্রিয়া এবং ব্যক্ত ক্রিয়া ও সুপ্ত ক্রিয়া

ভূমিকা: "আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান রূপকার আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে. মার্টন সমাজ কাঠামোর বিশ্লেষণে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তিনি প্রথাগত ক্রিয়াবাদের সীমাবদ্ধতা দূর করে দেখিয়েছেন যে, সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সবসময় কেবল ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে না। মার্টনের মতে, সামাজিক ক্রিয়া বা কাজগুলো যেমন উদ্দেশ্যমূলক হতে পারে, তেমনি তার কিছু লুকানো বা অপ্রত্যাশিত ফলাফলও থাকতে পারে।

মার্টনের এই তত্ত্বের প্রধান তিনটি স্তম্ভ হলো ব্যক্ত ক্রিয়া (Manifest Function), সুপ্ত ক্রিয়া (Latent Function) এবং অপক্রিয়া বা দুষ্ক্রিয়া (Dysfunction)। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে এর গঠনমূলক কাজের পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাবগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আজকের ব্লগ পোস্টে আমরা মার্টনের এই প্রভাবশালী তত্ত্বটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে আলোচনা করার চেষ্টা করব।"

মার্টনের দুষ্ক্রিয়া বা অপক্রিয়া কী? ব্যক্ত ক্রিয়া ও সুপ্ত ক্রিয়া কী

মার্টন দুষ্ক্রিয়া বা অপক্রিয়া:

মার্টন পূর্ববর্তী কাঠামোগত ক্রিয়াবাদীদের একমুখী দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করে ‘Disfunction’ ধারণাটি প্রবর্তন করেন। তাঁর মতে, কিছু সামাজিক প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক অনুশীলন সমাজব্যবস্থার সাথে সমন্বয় সাধনে ব্যর্থ হয় এবং এর ফলে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। এই ধরনের নেতিবাচক ফলাফলকেই দুষ্ক্রিয়া বা অপক্রিয়া বলা হয়।

মার্টনের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠান একদিকে সমাজের একটি অংশের জন্য কার্যকরী হলেও অন্যদিকে অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য তা অকার্যকরী হতে পারে। অর্থাৎ, কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে সর্বজনীনভাবে কার্যকরী বা অকার্যকরী বলা যায় না।

উদাহরণস্বরূপ, আমলাতন্ত্রকে শিল্পসমাজের জন্য একটি কার্যকরী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এতে দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু অতিরিক্ত নিয়ম-কানুন ও আনুষ্ঠানিকতার কারণে অনেক সময় এটি মানুষের সৃজনশীলতা ও মানবিক দিককে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। এ অবস্থায় আমলাতন্ত্র সমাজের জন্য দুষ্ক্রিয়ামূলক ভূমিকা পালন করে।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অপক্রিয়া:

পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অবাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যায় একচেটিয়া ব্যবসা ও পুঁজির কেন্দ্রীকরণ। ফলে অবাধ প্রতিযোগিতা ব্যাহত হয় এবং পুঁজিবাদ তার কাঙ্ক্ষিত কার্যকারিতা হারায়, যা মার্টনের দুষ্ক্রিয়ার একটি উদাহরণ।

অন্যদিকে, চীনের সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার ক্ষেত্রেও দুষ্ক্রিয়া লক্ষ করা যায়। সমাজতন্ত্রের মৌলিক নীতির পরিবর্তে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রভাব গ্রহণ করার ফলে সেখানে এক ধরনের ধনতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র গড়ে উঠেছে। এর ফলে সমাজতান্ত্রিক নীতিগুলো যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না, যা অপক্রিয়ার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে, রবার্ট কে. মার্টনের দুষ্ক্রিয়া বা অপক্রিয়া তত্ত্ব সমাজের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই তত্ত্বের আলোকে বাংলাদেশের সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও আইনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো প্রত্যাশিতভাবে কার্যকর হচ্ছে না। মাদকবিরোধী, সন্ত্রাসবিরোধী কিংবা যৌতুকবিরোধী আইনসমূহ প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি ও ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এই অবস্থাই মার্টনের দুষ্ক্রিয়া বা অপক্রিয়া তত্ত্বের বাস্তব প্রতিফলন।

রবার্ট কে. মার্টনের ব্যক্ত ক্রিয়া ও সুপ্ত ক্রিয়া

ভূমিকা: আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের আঙ্গিনায় যে কয়জন মনীষীর তাত্ত্বিক অবদান সর্বাঙ্গন কর্তৃক সমাদৃত হয়েছে তন্মধ্যে আমেরিকান সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট কে মার্টন অন্যতম। তিনি একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি বিজ্ঞানের সাথে সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ দিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করেন।

ব্যক্ত ক্রিয়া ও সুপ্ত ক্রিয়া:

কার্যকরী বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ব্যক্ত ক্রিয়া (Manifest Function) ও সুপ্ত ক্রিয়া (Latent Function)—এই দুটি প্রত্যয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রবার্ট কে. মার্টন তাঁর কার্যকরী বিশ্লেষণ তত্ত্বে এই দুটি ধারণার মাধ্যমে সামাজিক কর্মকাণ্ডের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য ফলাফলকে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

ব্যক্ত ক্রিয়া:

ব্যক্ত ক্রিয়া বলতে সেই সকল কার্যাবলিকে বোঝায়, যেগুলো মানুষ সচেতনভাবে ও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সম্পাদন করে এবং যার ফলাফল সম্পর্কে পূর্বানুমান থাকে। অর্থাৎ, Actor যখন কোনো লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে সচেতনভাবে কাজ করে, তখন সেই কাজের প্রত্যাশিত ফলই হলো ব্যক্ত ক্রিয়া। এর মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের ক্ষমতা, দক্ষতা ও সুযোগ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করে।

সুপ্ত ক্রিয়া:

সুপ্ত ক্রিয়া বলতে সেই সকল কার্যাবলিকে বোঝায়, যেগুলো ব্যক্তির সচেতন উদ্দেশ্যের অংশ নয় এবং যার ফলাফল সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্পষ্ট ধারণা থাকে না। অর্থাৎ, এখানে কাজটি ইচ্ছাকৃত হলেও তার সামাজিক ফলাফল অনিচ্ছাকৃত ও অপ্রত্যাশিত।

ব্যক্ত ও সুপ্ত ক্রিয়ার একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ হলো হোপি ইন্ডিয়ানদের বৃষ্টি উৎসব। এই উৎসবের ব্যক্ত ক্রিয়া হলো বৃষ্টি কামনা করা। কিন্তু বাস্তবে বৃষ্টি না হলেও উৎসবটি পালিত হয়। এর কারণ হলো এর সুপ্ত ক্রিয়া—যা সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উৎসব সংকটকালে গোষ্ঠীর মধ্যে সংহতি বৃদ্ধি করে, সামাজিক ঐক্য সুদৃঢ় করে এবং মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করে।

Intended ও Unintended ফলাফল:

মার্টনের মতে, প্রতিটি সামাজিক ক্রিয়ারই Intended (প্রত্যাশিত) এবং Unintended (অপ্রত্যাশিত) ফলাফল থাকতে পারে। সাধারণত মানুষ প্রত্যাশিত ফলাফল সম্পর্কে সচেতন থাকে, কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীরা অপ্রত্যাশিত ফলাফলের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বিশেষ করে মার্টন Unanticipated consequences ধারণার মাধ্যমে সুপ্ত ক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করেছেন।

তিনি বলেন, কোনো সামাজিক কাঠামো বা ব্যবস্থায় যে ফলাফল অনুমিত না হলেও কার্যকরী ভূমিকা পালন করে, সেটিই সুপ্ত ক্রিয়া। আবার যে অপ্রত্যাশিত ফলাফল ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর বা অকার্যকর হয়ে ওঠে, সেটিকে তিনি দুষ্ক্রিয়া (Dysfunction) বলেছেন। আর যে সকল ফলাফল না কার্যকরী, না অকার্যকর—বরং ব্যবস্থার সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক—সেগুলোকে তিনি Non-functional হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

দুষ্ক্রিয়া ও সামাজিক বৈষম্য:

মার্টন তাঁর Functional Theory তে উল্লেখ করেন যে, কোনো কোনো সামাজিক কাঠামো সমগ্র সমাজের জন্য দুষ্ক্রিয়ামূলক হলেও তা দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকান সমাজে কৃষ্ণাঙ্গ, নারী ও অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ সমাজের একটি বড় অংশের জন্য ক্ষতিকর হলেও সমাজের ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর জন্য তা কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। তবে এই বৈষম্যমূলক কাঠামো শেষ পর্যন্ত সেই সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর জন্যও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দুষ্ক্রিয়া সৃষ্টি করে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মার্টন মনে করেন, সমাজব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য সকল কাঠামো অপরিহার্য নয়। কিছু অংশ বাদ দিলেও সমাজব্যবস্থা টিকে থাকে। তাই অর্থপূর্ণ সমাজব্যবস্থা গড়ার জন্য আমাদেরকে সমাজের অ প্রভেদগুলো দূর করে সুন্দরভাবে সাজাতে হবে।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন