মার্টনের ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের উদ্দেশ্যগুলো লিখ

রবার্ট কে মার্টনের ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের উদ্দেশ্যসমূহ

ভূমিকা:- "আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ রবার্ট কে. মার্টন ক্রিয়াবাদী চিন্তাধারাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রথাগত সমাজতাত্ত্বিকরা মনে করতেন সমাজের প্রতিটি অংশই কেবল ভালো কাজ করে, কিন্তু মার্টন এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তাঁর ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজকাঠামোকে আরও বস্তুনিষ্ঠ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা।

মার্টন তাঁর তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা যেমন থাকতে পারে, তেমনি তার ক্ষতিকর দিক বা সুপ্ত দিকও থাকতে পারে। আজকের ব্লগে আমরা রবার্ট কে. মার্টনের ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ এবং এর পেছনে থাকা তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।"

মার্টনের ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের উদ্দেশ্য

নগরায়ন, শিল্পায়ন ও বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রভৃতি যে অচলাবস্থার জম্ম দেয় তা চিন্তাবিদদের মধ্যে নতুন চিন্তাধারার জম্ম দেয় বা অনুপ্রেরণা যোগায়। আর এ নব চেতনার বিকাশই ক্রিয়াবাদী সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে মার্টন অত্যন্ত সুন্দর ও দক্ষতার সাথে সামাজিক কাঠামোগত ক্রিয়াবাদীতত্ত্ব প্রদান করেন।

মর্টান বর্ণিত ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের উদ্দেশ্য:

রবার্ট কে মর্টানের ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের তিনটি উদ্দেশ্য রয়েছে।

যথা: ১।ক্রিয়াবাদ এর রক্ষণশীল মতবাদকে খন্ডন করা।

২। Funcitional Analysis প্রত্যয়গত এ তাত্ত্বিক কাঠামো বিস্তৃত করে।

৩। সমাজবিজ্ঞান তত্ত্ব তৈরীর কৈশল আবিষ্কার করে।

উপরিউক্ত তিনটি উদ্দেশ্যের উপর ভিত্তি করে মর্টান তিনটি বৈশিষ্ট্য এর কথা বলেন।

যথা- ১।সমাজব্যবস্থার ক্রিয়াগত ঐক্য

২। সামাজিক উপাদানসমূহের ক্রিয়াগত বিশ্বজনীনতা

৩। সমাজব্যবস্থায় ক্রিয়াগত উপাদানসমূহের অপরিহার্যতা

১। সমাজব্যবস্থার ক্রিয়াগত ঐক্য:

সমাজ ব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য ক্রিয়াগত ঐক্যর কথা বলেছেন মার্টন। ঐ সমাজের ক্রিয়াগত ঐক্য কতটুকু আছে তা জানার জন্য তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।তার মতে পুরো সমাজ ব্যবস্থা বা এর কোন অংশের Functional unity এর দিকে না দেখে বরং পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন অংশের ভিতরে unity বা ঐক্যের মাত্রা এ ধরন প্রত্যয় গবেষণার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করতে হবে। এভাবে বিভিন্ন আংশের ক্রিয়াগত ঐক্যের তারতম্য এবং কি প্রক্রিয়া এ তারতম্যের জন্য দায়ী তাও জানা যাবে।

২। সামাজিক উপাদান সমূহের ক্রিয়াগত বিশ্বজনীনতা:

মার্টন মনে করেন যে কোন স্বীকৃত সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ব্যবস্থায় সমগ্র সমাজের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না।এ নিয়ে তিনি অন্যান্য সমাজবিজ্ঞানীদের সাথে যুক্তিতর্ক করেন। এক্ষেত্রে তিনি ২টি বিষয় উপস্থাপন করেন। যথা:-

(ক) উপাদানগুলো সবসময় ইতিবাচক নয় বরং নেতিবাচক ভূমিকাও রাখতে পারে।

(খ) কিছু কিছু উপাদানের ভূমিকা ব্যক্ত হতে পারে আবার কিছু কিছু সুপ্ত হতে পারে।

৩। সমাজব্যবস্থায় ক্রিয়াগত উপাদানসমূহের অপরিহার্যতা:

মার্টন সমাজব্যবস্থায় ক্রিয়াগত উপাদানের অপরিহার্যতার কথা বলতে গিয়ে দুটি বিষয় তুলে ধরেছেন। যেমন-

(ক) সত্যিই কি সমাজব্যবস্তায় ক্রিয়াগত অপরিহার্যতা রয়েছে যার পরিপূরক দরকার?

(খ) সত্যিই কি কিছু ক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য অপরিহার্যরুপে কিছু কাঠামো বিদ্যমান?

প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলেন- কিছু পূর্ব শর্তের প্রয়োজন আছে তবে তা বাস্তব অভিঙ্গতার আলোকে সমাজব্যবস্থার নিরিক্ষে উপলব্ধি করতে হবে।

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলেন- শুধুমাত্র এক ধরনের কাঠামোই ক্রিয়াগত পূর্বশর্ত পূরণ করতে পারে না।তার জন্য বিকল্প কাঠামো দরকার যা একই প্রয়োজন বিকল্পভাবে একইভাবে মিটাতে পারে। এ ধারণা থেকেই Functional Alternative এর আবিষ্কার করেন।

ক্রিয়াবাদের সংশোধন ও আধুনিকায়ন: মার্টনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ট্যালকট পারসন্স ও ম্যালিনোস্কির মতো তাত্ত্বিকদের 'সর্বজনীন ক্রিয়াবাদ' (Universal Functionalism)-এর ভুলগুলো সংশোধন করা। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, সমাজের সব অংশ সবসময় উপকারী নয়।

ব্যক্ত ও সুপ্ত ক্রিয়ার পার্থক্য নির্ণয়:

সমাজের কোনো কাজের প্রত্যক্ষ বা দৃশ্যমান উদ্দেশ্য (Manifest Function) এবং এর আড়ালে থাকা পরোক্ষ বা অদৃশ্য ফলাফল (Latent Function) আলাদা করে চিহ্নিত করা ছিল তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য।

অক্রিয়াবাদ বা অপক্রিয়া (Dysfunction) চিহ্নিতকরণ:

মার্টন দেখাতে চেয়েছিলেন যে, সামাজিক কাঠামো বা কোনো প্রতিষ্ঠান (যেমন: আমলাতন্ত্র বা কোনো প্রথা) সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্টও করতে পারে। এই নেতিবাচক প্রভাব খুঁজে বের করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

বিকল্প ক্রিয়াবাদ (Functional Alternatives) খোঁজা:

সমাজের একটি প্রয়োজন মেটানোর জন্য কেবল একটিই নির্দিষ্ট পথ বা প্রতিষ্ঠান থাকবে এমন নয়। একই কাজ সম্পাদনের জন্য একাধিক বিকল্প ব্যবস্থা থাকতে পারে এটি প্রমাণ করাও তাঁর উদ্দেশ্য ছিল।

তাত্ত্বিক গবেষণাকে বাস্তবমুখী করা:

মার্টন চেয়েছিলেন সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বগুলো যেন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে গবেষণার (Empirical Research) উপযোগী হয়।

উপসংহার: সর্বশেষ বলা যায় মার্টনের সকল তত্ত্বের মধ্য ক্রিয়াবাদ তত্ত্ব অন্যতম । যদিও এর অনেক সমালোচনা রয়েছে তবে এটির ভালো দিকও রয়েছে। যা যথার্থ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজবিজ্ঞানের ক্রমবিকাশে তাৎপর্যপূর্ণ কাজে লাগানো যেতে পারে।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন