ট্যালকট পারসন্সের AGIL প্রত্যয় আলোচনা
ভূমিকা:- "বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ট্যালকট পারসন্স (Talcott Parsons) সমাজকে একটি জটিল ও আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা হিসেবে দেখেছেন। তিনি তাঁর 'সামাজিক ব্যবস্থা' (Social System) এবং 'সামাজিক ক্রিয়া' (Social Action) তত্ত্বের মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজ টিকে থাকে এবং পরিবর্তিত হয়। পারসন্স বিশ্বাস করতেন, যেকোনো সামাজিক ব্যবস্থাকে টিকে থাকতে হলে এবং ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়।
এই প্রয়োজনীয় কাজগুলোকে তিনি একটি সূত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন, যা সমাজবিজ্ঞানে 'AGIL প্রত্যয়' বা AGIL Model নামে পরিচিত। এটি মূলত চারটি ইংরেজি শব্দের আদ্যক্ষর নিয়ে গঠিত। ট্যালকট পারসন্সের এই বিখ্যাত AGIL মডেলের প্রতিটি স্তর এবং এর গুরুত্ব নিয়ে আজ বিস্তারিত আলোচনা করব।"
ট্যালকট পারসন্সের দৃষ্টিভঙ্গিতে সামাজিক ক্রিয়া, সামাজিক পরিবর্তন এবং সমাজব্যবস্থা একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এই কাঠামোর মধ্য দিয়ে তিনি ‘AGIL’ নামক একটি বিশ্লেষণ কাঠামো তৈরি করেন যা সমাজের যেকোনো ব্যবস্থার টিকে থাকার জন্য চারটি মৌলিক কার্যকারিতার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে।
AGIL পরিকল্পনার ব্যাখ্যা:
নিম্নে সংক্ষেপে ট্যালকট পারসন্সের AGIL প্রত্যয়টির ব্যাখ্যা দেওয়া হলো-
১। অভিযোজন (Adaptation):
অভিযোজন পদ্ধতি এবং পারস্পরিক অবস্থার মধ্যে সম্পর্ক দেখানো হয়। এটা দুই ধরনের। যথা- (ক) বশ্যতা বা আত্মসমর্পণ (খ) সুবিধাকরণ।
পরিবেশের চাপের মাধ্যমে বশ্যতা স্বীকার করা হয়। আর সুবিধাকরণ হলো অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।
২। লক্ষ্য অর্জন (Goal Attainment):
পারসন্সের মতে প্রত্যক কাজের পিছনেই একটি Goal বা লক্ষ্য রয়েছে। লক্ষ্য দুই প্রকার যথা (ক) অভিপ্রায় লক্ষ্য (খ) অনভিপ্রায় লক্ষ্য।
অভিপ্রায় লক্ষ্য (Intended goal): এটা মানুষের জন্য জরুরি ও প্রাথমিক প্রয়োজন নির্দেশ করে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য অর্থনৈতিক স্বচ্চলতা আনয়ন করা।
অনভিপ্রায় লক্ষ্য (Unintended goal): মানুষের সব লক্ষ্যই অভিপ্রায় লক্ষ্য নয় কিছু কিছু লক্ষ্য অনভিপ্রায় হয়।
৩। একাঙ্গীকরণ বা মিশ্রণ (Integration):
সমাজ ব্যববস্থায় যেসব কার্যকারীতা রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একাঙ্গীকরণ (Intergration)। সামাজিক ব্যবস্থায় অনেক সদস্য বাস করে সুতরাং এ বসবাসকারী সদস্যদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক থাকতে হয়। একাঙ্গীকরণ এর কাজ হলো সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয় করা।
৪। আদর্শরীতির রক্ষণাবেক্ষণ (Latency):
সমাজের দুটি সংঘর্ষমূলক পরিস্থিতির মাঝখানে যে স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজমান করে তাই হলো আদর্শরীতির রক্ষণাবেক্ষণ। প্রত্যেক সমাজের গুরুত্ব পূর্ণ প্যাটার্ন হলো বিলম্ব।
সামাজিক ব্যবস্থা ও উপব্যবস্থা:
সমাজের কাঠামো কিভাবে তৈরি হয় এবং অন্যান্য পদ্ধতির সাথে কীভাবে সমন্বয় করা যায় সেটাই এর আলোচ্য বিষয়। এক্ষেত্রে পারসন্স চারটি পদ্ধতির কথা বলেছেন।
(ক) সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা:
সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় বিষয় হলো ভাষাগত এবং সব সাংকেতিক ব্যবস্থা। পারসন্সের মতে আমাদের সব সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা সমাজের মূল্যবোধ ব্যক্তি আত্মস্থ করে।
(খ) সমাজব্যবস্থা:
সমাজ ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় একক হলো ভূমিকা প্রত্যাশা। আমরা সবার কাছে কিছু না কিছু আশা করি।
(গ) ব্যক্তিত্ব ব্যবস্থা:
ব্যক্তিত্ব ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় একক হলো স্বতন্ত্র কর্ম। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি।
(ঘ) আচরণিক জৈব তত্ত্ব ব্যবস্থা:
আচরণিক তত্ত্বের কেন্দ্রীয় প্রত্যয় হলো জৈবিক অনুভূতি। পারসন্স বলেন সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় সব কিছু একে অপরের সাথে যুক্ত।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, AGIL মডেল সমাজবিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ কাঠামো। সমাজ কীভাবে টিকে থাকে, কাজ করে এবং পরিবর্তনের সাথে খাপ খায়, তা বুঝতে এই তত্ত্ব সহায়ক।ট্যালকট পারসন্সের সামাজিক পদ্ধতি AGIL তত্ত্বের কিছু সমলোচনা থাকলেও সমাজবিজ্ঞানে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পারসন্স যতগুলি তত্ত্ব প্রদান করেছেন তার মধ্যে সমাজব্যবস্থা তত্ত্বই অন্যতম। AGIL প্রত্যয় সমাজের কাঠামোগত ও কার্যকরী বিশ্লেষণে একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক মডেল হিসেবে বিবেচিত।
