সমাজবিজ্ঞানে প্যারাডাইম নির্মাণের গুরুত্ব আলোচনা কর

সমাজবিজ্ঞানে প্যারাডাইম নির্মাণের গুরুত্ব আলোচনা

ভূমিকা: সমাজবিজ্ঞানের গবেষণায় প্যারাডাইম শব্দটি একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। টমাস কুন-এর "The Structure of Scientific Revolutions" গ্রন্থে প্যারাডাইম শব্দটি প্রাধান্য পায়। প্যারাডাইম হলো প্রপঞ্চ সম্পর্কে অন্তর্নিহিত ও সুস্পষ্ট ধারণার সমষ্টি। প্রতিটি প্যারাডাইম তার নিজস্ব প্রত্যয় দ্বারা সম্পূর্ণ।

সমাজবিজ্ঞানে প্যারাডাইম নির্মাণের গুরুত্ব আলোচনা

সমাজবিজ্ঞানে প্যারাডাইম নির্মাণের গুরুত্ব:

সমাজবিজ্ঞানে প্যারাডাইম নির্মাণের গুরুত্ব নিচে আলোচনা করা হলো।

১. সমাজকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ:

প্যারাডাইমের মাধ্যমে সমাজকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। যেকোনো সনাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্যারাডাইম নির্মাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি সমাজকে দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে দেয়।

২. নিজস্ব প্রত্যয়:

প্যারাডাইমের নিজস্ব প্রত্যয় রয়েছে। যেমন- ম্যালথাসের গাণিতিক হার, জ্যামিতিক হার, ইতিবাচক রোধ ইত্যাদি। মার্কসীয় প্যারাডাইমে শ্রেণি, শ্রেণি সচেতনতা, শ্রেণিসংঘাত, উৎপাদন উপায়, উৎপাদন সম্পর্ক, উদ্বৃত্ত শ্রম, উদ্বৃত্ত শোষণ, মজুরি, মুনাফা প্রভৃতি পৃথক পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে থাকে।

৩. নতুনত্বের ধারণা:

কুন প্যারাডাইম নতুনতর ধারণায়, পদ্ধতিতত্ত্ব সমস্যা শনাক্তকরণ ও ব্যাখ্যা প্রদানে সক্ষম। কুন একে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব বলে অভিহিত করেছেন। যেমন- নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ আবিষ্কার প্রচলিত পূর্ব ধারণাকে পাল্টে দেয়। আবার মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুরাদ ব্যাখ্যা ও ফ্রয়েডের ব্যক্তিত্ব তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানে কুন প্যারাডাইম হিসেবে বিবেচিত।

৪. বিশেষ প্রপঞ্চের প্রতিনিধিত্ব

প্যারাডাইম বিশেষ প্রপঞ্চের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। নতুন ধারণায়িতকরণ প্রচেষ্টা নতুন গবেষণার প্রশ্নের সুপারিশ করতে পারে। সমাজবিজ্ঞানের ক্রিয়াবাদ, বিনিময় তত্ত্ব, উপযোগ তত্ত্ব, শিক্ষণ তত্ত্ব, অভিযোজন তত্ত্ব প্রভৃতি প্যারাডাইম হিসেবে অধিক গুরুত্ব বহন করে থাকে।

৫. তাত্ত্বিক কাঠামো প্রদান:

সমাজবিজ্ঞানের প্যারাডাইম কেন্দ্রীয় প্রত্যয়সমূহের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাত্ত্বিক কাঠামোর রূপ দান করে থাকে। এক্ষেত্রে প্যারাডাইম পূর্ববর্তী প্রত্যয় থেকে যুক্তশীল প্রত্যয়-এর ধারণা দেয়। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে প্যারাডাইম তত্ত্ব নির্মাণের জন্য সঙ্গতিপূর্ণ তাত্ত্বিক কাঠামো প্রদান করে থাকে।

৬. সম্ভাব্যতার মাত্রা হ্রাস:

সমাজবিজ্ঞানে প্যারাডাইন সমাজ বিশ্লেষণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতার মাত্রা কমিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছাতে সাহায্য করে থাকে। Probability-এর মামতি কমিয়ে যুক্তির প্রতি ধাবিত হওয়া Social Paradigm-এর একটি অন্যতম লক্ষ্য।

৭. পদ্ধতিগত দিক:

পদ্ধতি ও উপকরণের প্রয়োগের দিক থেকে প্যারাডাইম পৃথকভাবে ভূমিকা রাখছে। অধ্যাপক Miroslav বলেন, পুরাতন সমাজতাত্ত্বিক প্যারাডাইম ধ্রুপদী সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। যেমন- দৃষ্টবাদ, ক্রিয়াবাদ, কাঠামোবাদ ইত্যাদি। অন্যদিকে নতুন সমাজতাত্ত্বিক প্যারাডাইম সম্পূর্ণ নতুন ধারণা ও জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়েছে। যেমন- সামাজিক গতিশীলতা, সৃজনশীলতা প্রভৃতি।

৮. কার্যপ্রণালির সারসংক্ষেপ প্রদান

সমাজবিজ্ঞানে প্যারাডাইম সমাজে বিদ্যমান সমস্যাসমূহের বাস্তবধর্মী এবং তাত্ত্বিক অনুসন্ধানী কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এছাড়াও সারসংক্ষেপ ও একত্রীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্যারাডাইম আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক গবেষণার কার্যপ্রণালির

৯. তত্ত্ব নির্মাণে বস্তুনিষ্ঠ সমাধান

সমাজবিজ্ঞানীদের একটি প্রধান কাজ তত্ত্ব নির্মাণ করা। সমাজবিজ্ঞানে তত্ত্ব নির্মাণে ব্যাপক সমস্যা রয়েছে। প্যারাডাইম সমাজবিজ্ঞানে তত্ত্ব নির্মাণে বস্তুনিষ্ঠ সমাধানের চেষ্টা করে থাকে। এক্ষেত্রে সমাজ গবেষণার সময় যতটা সম্ভব নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করা হয়।

১০. সামাজিক মানদণ্ড:

সমাজবিজ্ঞানের জন্য কোনো নিরপেক্ষ মানদণ্ড নেই। তাই প্যারাডাইমই কেবল যতটা সম্ভব নিরপেক্ষ হিসেবে সমাজবিজ্ঞানের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। তাই সমাজবিজ্ঞানে প্যারাডাইম সামাজিক মানদণ্ড হিসেবে অধিক গুরুত্ব বহন করে থাকে।

১১. প্যারাডাইম ভেরিয়েশন

প্যারাডাইম ভেরিয়েশন হলো কুন প্যারাডাইনের প্রতিষ্ঠার পর নানারকম সংশোধন ও পুনর্ব্যাখ্যামূলক ধারণার প্রুক্ষেপ, যা মৌলিক প্যারাডাইম থেকে উৎসারিত। সমাজবিজ্ঞানে অসংখ্য প্যারাডাইম ভেরিয়েশন রয়েছে। যেমন- পুঁজিবাদের নব্য মার্কসীয় তত্ত্বসমূহ।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজবিজ্ঞানে প্যারাডাইম প্রত্যয়ের ধারণা দেয়, সম্ভাব্যতার গুরুত্ব কমায় এবং পুঞ্জীভূত তত্ত্বসমূহের কার্যকর ব্যাখ্যা প্রদান করে থাকে। এখানে প্যারাডাইম গুণবাচক বিশ্লেষণের সারসংক্ষেপকরণ করে থাকে। সুতরাং সমাজবিজ্ঞানে প্যারাডাইম নিঃসন্দেহে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

নবীনতর পূর্বতন