ভূমিবিচ্ছিন্নতা কী? ভূমিবিচ্ছিন্নতার কারণ ও ফলাফল ব্যাখ্যা কর

ভূমিবিচ্ছিন্নতার সংজ্ঞা কারণ ও ফলাফল আলোচনা

ভূমিকা: মানুষের জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ভূমি। ভূমি মানুষের বাসস্থান, জীবিকা ও নিরাপত্তার উৎস।

ভূমিবিচ্ছিন্নতা কী? ভূমিবিচ্ছিন্নতার কারণ ও ফলাফল

ভূমিবিচ্ছিন্নতার সংজ্ঞা

কোনো জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বা অনিচ্ছাকৃতভাবে তাদের ভূমি ও আবাসন থেকে উচ্ছেদ করে অন্যত্র স্থানান্তরিত করার প্রক্রিয়াকেই ভূমিবিচ্ছিন্নতা বলে। একে জোরপূর্বক স্থানান্তর (Forced Migration) বা অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি (Internal Displacement) নামেও ডাকা হয়। এটি সাধারণত উন্নয়ন প্রকল্প, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক বা ধর্মীয় কারণসহ নানা কারণে ঘটে থাকে।

ভূমিবিচ্ছিন্নতার কারণসমূহ

ভূমিবিচ্ছিন্নতার পিছে বিভিন্ন কারণ বিদ্যমান নিম্নে সেসকল কারণ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১. সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প:

দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অনেক সময় বৃহৎ এলাকা অধিগ্রহণ করতে হয়। যেমন- গৃহায়ন প্রকল্প, শিল্প এলাকা, বাঁধ, সড়ক বা কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প। এসব প্রকল্পের জন্য সরকার ভূমি অধিগ্রহণ করলে বহু মানুষ তাদের বাসস্থান হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়।

২. রাজনৈতিক কারণ:

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উপনিবেশ স্থাপন, বা ক্ষমতা সংরক্ষণের প্রয়োজনে কোনো গোষ্ঠী বা জনগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি থেকে বিতাড়ন করা হয়। রাজনৈতিক ভয়ভীতি, নিপীড়ন ও দমননীতিও ভূমিবিচ্ছিন্নতার বড় কারণ।

৩. অর্থনৈতিক কারণ:

শিল্পায়ন, বাণিজ্যিকীকরণ ও বেসরকারি মুনাফার জন্য ভূমি দখল বা স্বল্পমূল্যে ক্রয়ের মাধ্যমে দরিদ্র জনগণকে তাদের জায়গা থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ফলে তারা ভূমিহীন ও দারিদ্র্যপীড়িত হয়ে পড়ে।

৪. ধর্মীয় কারণ:

ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও দাঙ্গার ফলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী প্রায়ই নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নিজ ভূমি ত্যাগে বাধ্য হয়। ইতিহাসে এ ধরনের বহু উদাহরণ বিদ্যমান।

৫. পরিবেশগত কারণ:

দূষণ, বন উজাড়, শিল্পবর্জ্য ও অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে কোনো অঞ্চল বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তখন মানুষ বাধ্য হয়ে স্থানান্তরিত হয়।

৬. প্রাকৃতিক দুর্যোগ:

বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বহু মানুষ তাদের ভূমি হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়।

৭. জাতিগত ও আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব:

জাতিগত বিদ্বেষ, গোষ্ঠীগত সংঘর্ষ বা আন্তর্জাতিক যুদ্ধে মানুষ নিরাপত্তার জন্য নিজ ভূমি ত্যাগ করে শরণার্থী হয়ে পড়ে।

৮. মানবসৃষ্ট সংকট:

খাদ্য ঘাটতি, দুর্ভিক্ষ বা কৃত্রিমভাবে তৈরি সংকটও ভূমিবিচ্ছিন্নতার কারণ হতে পারে, যেখানে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য নিজের জায়গা ছাড়তে বাধ্য হয়।

ভূমিবিচ্ছিন্নতার ফলাফল:

ভূমিবিচ্ছিন্নতার ফলে যেসকল সমস্যা হয়ে থাকে সে সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১. দারিদ্র্যের বিস্তার:

বাস্তুচ্যুত জনগণ জীবিকার উৎস হারিয়ে দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়ে যায়।

২. খাদ্য ও বাসস্থানের সংকট:

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত জনগণ আশ্রয়হীন ও খাদ্য সংকটে পড়ে।

৩. শরণার্থী সমস্যা:

দেশের ভেতরে ও বাইরে শরণার্থী সংকট দেখা দেয়।

৪. জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা:

এক এলাকায় জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।

৫. অর্থনৈতিক ক্ষতি:

জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন কমে যায় এবং GDP ও GNP প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পায়।

৬. পরিবেশগত ক্ষতি:

বাস্তুসংস্থান ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

৭. সামাজিক অস্থিরতা:

বেকারত্ব, অপরাধপ্রবণতা ও সংঘাত বৃদ্ধি পায়।

৮. সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ:

পুনর্বাসন ব্যর্থ হলে সরকারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।

উপসংহার: ভূমিবিচ্ছিন্নতা কেবল একটি সামাজিক বা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি মানবাধিকারেরও প্রশ্ন। এটি মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা ও মর্যাদার ওপর গভীর আঘাত হানে। এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে পরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনা, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তবেই ভূমিবিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী পুনরায় সমাজে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে এবং একটি ন্যায্য, মানবিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হবে।

Comments

Popular posts from this blog

রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর

টার্ম পেপার (term paper) কী? টার্ম পেপার লেখার নিয়ম অনার্স-মাস্টার্স

রাজনৈতিক যোগাযোগ কী? রাজনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্ব