বনভূমির উপর ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়সমূহের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা

বনভূমির উপর আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা

ভূমিকা: বিশ্বব্যাপী ৫০০০ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগত সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত ৩০০ মিলিয়ন মানুষ বসবাস কবে। এরা সমগ্র পৃথিবীর জনসংখ্যার চার শতাংশ হলেও বিশ্বব্যাপী সংস্কৃতি বৈচিত্র্যের ৯৫% এরা ধারণ করে। বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলো এত ঘনিষ্ঠভাবে পরিবেশের উপর নির্ভরশীল যে, এর জঙ্গল হতে তাদের উৎপাটন করা হলে অনেকে তাদের নিজস্বতা হারিয়ে ফেলেন। আবার বনভূমিও তার আকৃতি ও প্রকৃতিগত শুদ্ধতা হারিয়ে ফেলতে থাকে। যদি বিভিন্ন কারণে বন বিনষ্ট করা হয়, তাহলেও এদের অস্তিত্ব সংকট তৈরি হয়।

বনভূমির উপর ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়সমূহের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা


বনভূমির উপর ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়সমূহের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা

যেসব কারণে বনের উপর এসব সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর এই প্রকার আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়, তা নিম্নের আলোচনায় তুলে ধরা হলো-

১. জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ:

পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ বনভূমির বেশিরভাগ অংশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র সংস্কৃতির মানুষ অধিষ্ঠান করছে। এসব জীববৈচিত্র্য এসব মানুষের হাতে থাকলে তা জীব ধ্বংস, উদ্ভিদ ধংস করবে এই প্রকার চিন্তা হতে অনেক স্থানে এসব মানুষকে সরিয়ে দিয়ে সুবৃহৎ ইকোপার্ক প্রকল্প সুথবা সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে কৃত্রিম তত্ত্বাবধানে বনভূমি সংরক্ষণের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কার্যত এসব প্রকল্প ফলপ্রসূ হয়নি। দেখা গেছে সেসব স্থানে কাঠ চুরি, বন্যপ্রাণী নিধন ইত্যাদি বিভিন্ন অসাধু উপায় বৃদ্ধি পেয়েছে ক্রমশ বরং যেসব বনভূমিতে ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়দের বের করে দেয়া হয়নি সেসব বনভূমিতে এসব মানুষ প্রাকৃতিক প্রহরীর মতো এসব বৃক্ষ ও প্রাণীকে রক্ষা করেছে।

২. প্রকৃতি বিশুদ্ধ পানির উৎস সংরক্ষণ:

সুপেয় পানির উৎসগুলো সংরক্ষণের প্রাকৃতিক দায়িত্ব এসব বনভূমিস্থ ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলোর হাতে থাকে। এই পানি তাদের খাদ্য পানিয়ের এবং অন্যান্য ব্যবহার্য পানির একমাত্র উৎস। তাই এরা এই উৎসগুলোকে পরম মমতায় সংরক্ষণ করে। যদি এসব পানির উৎস সংরক্ষণ এরা না করে অন্যরা করত তাহলে তা বিবিধ দূষণের কবলে পতিত হতো। এসব জলাধারের পরিমাণ বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে ক্রমহ্রাসমান। তাই এই পানি সংরক্ষণে এদের উপর প্রাকৃতিক অর্পিত দায়িত্বকে আরও প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজনে বনভূমির উপর এদের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠায় জোর দেয়া হয়।

৩. প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ:

আফ্রিকা মহাদেশ, দক্ষিণ আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন অংশে ঘন বনভূমি নিজেই অতি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। যেমন- বৃক্ষরাজি এবং অতি মূল্যবান পশুসম্পদের উৎস, অন্যদিকে বহুবিধ মূল্যবান খনিজপ্রাকৃতিক সম্পদও এই বনভূমির নিচে আছে। এই মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষণের প্রাকৃতিক দায়িত্ব বনভূমির মানুষরা নিজেরা পালন করে, অনেক সময়ে এই সম্পর্কের সঠিক মূল্য না জেনেই। আবার এরা এসব সম্পদের বাজারদর জানার পরেও নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিশ্বাস করতে থাকে এসব সম্পদ ব্যবহার বা বিক্রয়যোগ্য নয় এবং তা সংরক্ষণ করার মহান দায়িত্ব তাদের উপর অর্পিত। এভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে এরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৪. আবহাওয়া পরিবর্তন রোধকল্প:

পৃথিবীর বনভূমির অঞ্চলে বৃক্ষরাজি বৈশ্বিক উষ্ণতা স্বল্পায়নে এবং গাছের শিকড় হারা জলস্রোত আটকে রাখতে সাহায্য করে এবং এভাবে তা আবহাওয়া পরিবর্তনের বিরূপতা হ্রাসকরণে ভূমিকা রাখে। ক্ষুদ্র সম্প্রদায়গুলো বনভূমিতে এসব বৃক্ষ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে যোহতু বৃক্ষ তাদের খাদ্য, আশ্রয় এবং বিভিন্ন জীবিকার উৎস তাই তারা নিজেদের অবলম্বন বৃক্ষ কাটতে দেয় না এবং এভাবে পরোক্ষভাবে তারা পরিবেশ পরিবর্তনকে রুখে দেয়। এই পরিবেশ পরিবর্তনকে বন্ধ করবার জন্য বৃক্ষ সংরক্ষণের আইনি দায়িত্ব তাদের দেয়ার কথা বলা হয়।

৫. প্রাকৃতিক দুর্যোগ রক্ষা:

বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিপরীতে বনভূমি ক্ষতিরোধক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। গাছ তার শিকড় দ্বারা মাটি আটকে রাখে। তাই বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে তা মানুষের বসতিকে রক্ষা করে এবং বন্যার গতি কমিয়ে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতিকে কমিয়ে দেয়। অন্যান্য আরও অনেক ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগেও গাছ মানুষকে রক্ষা করে। বনভূমি মানেই অনেক গাছের সমারোহ। অনেক গাছ যারা তা মানুষের পরিবেশকে দুর্যোগ হতে রক্ষা করে। গাছের রক্ষক হিসেবে বনজীবী মানুষদের অধিকার সংরক্ষণের আইন নির্ধারিত হলে মানুষের আবাস হিসেবে পৃথিবী অনেক বেশি দুর্যোগ হতে রক্ষা পাবে।

৬. গ্রিনহাউজ গ্যাসের ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাস:

পৃথিবীয় বিভিন্ন মানবসৃষ্ট স্থাপনা হতে দূষণকারী পদার্থ উৎপন্ন হয়, যা বায়ুমন্ডলে মিশে গিয়ে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি হতে রক্ষাকারী বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউজের মতো বিদ্যমান প্রতিরোধক অংশকে ভাসে করে দেয় এবং ক্ষতিকর বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করে, যা গ্রিনহাউজ গ্যাল নামে পরিচিত। এই গ্যাসের প্রভাবে পৃথিবীব্যাপী উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উত্তর-দক্ষিণ মেজর বরফ গলিয়ে দিয়ে পৃথিবীর পানির স্তর বাড়িয়ে নিয়ে মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলছে।

৭. অক্সিজেনের উৎস রক্ষা:

বৃক্ষ আমাদের জীবন রক্ষায় ভূমিকা পালন করে। সমগ্র পৃথিবীর যে বনভূমি রয়েছে তাই মূলত পৃথিবীয় অক্সিজেনের সব থেকে বড় উৎস। বনভূমি না থাকলে গাছ থাকবে না, গাছ না থাকলে অক্সিজেন থাকবে না আর অক্সিজেন না থাকলে আমাদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়বে। এই অক্সিজেনের উৎস রক্ষার একমাত্র দাবিদার হতে পারে বনজীবী এসব ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়। তাই তাদের Forest steward বা ধনেয় অলিখিত রক্ষী হিসেবে তাদের অধিকার জাতীয় পর্যায়ে তাদের পক্ষে আইন তৈরি এবং বাস্তবায়ন দরকার।

৮. বিভিন্ন ঔষধ এবং চিকিৎসা উপকরণ সরবরাহ:

বনের বৃক্ষ হতে প্রাপ্ত লতাগুল্ম এবং বিভিন্ন প্রকার রসের সমন্বয়ে যে ঐষধি তৈরি হয় তার উপর নির্ভর করে পৃথিবীর অনেক ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতি দাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এসব ভেষজ চিকিৎসা অত্যন্ত ফলপ্রসু হিসেবে চিহ্নিত। যেমন- ইউনানী, কবিরাজি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি, আবার পাশাপাশি মূলধারার চিকিৎসাব্যবস্থায় যে বিভিন্ন ধরনের ঔষধি উপকরণ ব্যবহৃত হয় তারও একটি অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে বৃক্ষরাজি। এসব ঔষধের উৎস হিসেবে এবং বৃক্ষের সংরক্ষণ এবং প্রতিপালন করা দরকার।

৯. বিভিন্ন খাদ্য উপকরণ সরবরাহ:

বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য, যা আমরা খাই তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উৎস হলো বৃক্ষ। এমনকি যেসব খাদ্য উদ্ভিজ্জ নয়, সরাসরি প্রাণিজ সেসব প্রাণীও খাদ্যের জন্য অন্য প্রাণী বা উদ্ভিদের উপরেই নির্ভরশীল। এভাবে কোনো খাদ্যকে সম্পূর্ণরূপে উদ্ভিদ বিচ্যুত করে ভাবা সম্ভব নয়। ফলমূল, শাকসবজি সরাসরি উদ্ভিদ থেকেই আসে। বনভূমি পৃথিবীয় সমগ্র জীবজগতের খাদ্যের একটি অন্যতম প্রধান উৎস। তাই আমাদের খাদ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে হলে বনভূমিকে তার আকার এবং প্রকৃতি অক্ষুন্ন রেখে সংরক্ষণ করা দরকার। বনজীবী সম্প্রদায় নিজেরাও তাদের সবরকম খাদ্যের জন্য সর্বাংশে বনভূমির উপর নির্ভরশীল।

১০. আশ্রয় এবং বিভিন্ন গৃহস্থালি উপকরণ সরবরাহ:

পৃথিবীর দরিদ্র, অর্ধদরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ তাদের আশ্রয়ন এবং গৃহস্থালির প্রত্যেকটি উপকরণের জন্য সরাসরি উদ্ভিদ এবং বনজ উৎসের উপর নির্ভরশীল। এর কারণ এসব বস্তু অর্থ দিয়ে তারা আয় করে না। অর্থ দিয়ে আয় করার অর্থনৈতিক সামর্থ্য তাদের নেই। তারা বননির্ভর জীবনযাপন করে বলে তাদের এসব উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক। এজন্যই এরা নিজেরাই বলরক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তাই বন রক্ষকের ভূমিকা যদি আইনগতভাবে তাদের উপর ন্যস্ত করা হয় তাহলে তা তাদের বন সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করবে।

১১. প্রতিবেশ রক্ষা:

পরিবেশের সাথে মানুষ এবং অন্য প্রার্থীদের আন্তঃসম্পর্কায়নের যে বিচিত্র প্রপঞ্চ তাকে প্রতিবেশ বা ecology বলে। বাস্তুসংস্থানের প্রতিটি ছোট উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো একটি উপাদানের পরিবর্তন বা সরে যাওয়া সমগ্র বাস্তুসংস্থানকে হমকির মুখে ফেলে। বনের যে প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান ক্রিয়াশীল তার একটি অধিপ্রিন্ন অংশ হলে এসব সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ। যদি তাকে সরিয়ে ফেলা হয় তাহলে সমগ্র বাস্তুসংস্থানটি হুমকিতে পড়ে যাবে। এই বাস্তুসংস্থানকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই মানুষগুলোকে অত্যাবশ্যকভাবে এখানে বেঁধে রাখায় একটি অন্যতম কৌশল হতে পারে আইন করে তাদের বনভূমির অধিকার তৈরি করে তাদের বনের অধিকার নিশ্চিত করা।

১২. পরিবেশের টেকসইতা নিশ্চিতকরণ:

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে এটি মোটামুটি পরিচিত যে, বিভিন্ন শিল্পনির্ভর উন্নয়ন কাঠামোগুলোতে মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটালেও তা পরিবেশের টেকসইতা নষ্ট করে দিচ্ছে। পরিবেশ দিন দিন আরও ধ্বংসর দিকে যাচ্ছে। এসব সম্প্রদায় নিজের প্রয়োজনে বনভূমি রক্ষা করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পরিবেশ রক্ষা করে তারা আমাদের জীবন রক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখছে। তাই এদের হাতেই পরিবেশ রক্ষার আইনি অধিকার ন্যস্ত হওয়া দরকার। এই অনুভব হতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলোর পক্ষ থেকে বনজীবী সম্প্রদায়গুলোর পক্ষে বনের অধিকার প্রদানের দাবি উত্থাপন করে আসছে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, পৃথিবীর যেসব অংশ এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা কম সেখানে পরিবেশ বৈচিত্র্য এবং আবহাওয়া দূষণ প্রায় ভাংসোনুখ বাস্তবতার সম্মুখীন হাচ্ছে প্রতিনিয়ত পৃথিবীর ১৭৫টি দেশের ৮৪টিতে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আবাস রয়েছে। এয়া প্রকৃতি নির্ভর নিজস্ব ক্ষুদ্র সংস্কৃতির মানুষ। প্রকৃতির সাথে এদের আত্মিক সম্পর্ক। তাই প্রকৃতি রক্ষা হলে তারা নিজেরা বাঁচবে- এ ধরনের সমাজ সাংস্কৃতিক মানস হতে এরা পরিবেশ রক্ষায় আগ্রহী হয় এবং অনেক সময়ে পরিবেশকে নিজেদের আত্মার অংশ মনে করে।

No comments:

Post a Comment