ইউরোপে পুঁজিবাদের বিকাশ: ইতিহাস ও প্রধান কারণসমূহ
ভূমিকা: বর্তমান আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদ। তবে এর শিকড় বহু শতাব্দী পুরোনো। মধ্যযুগের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত নানা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে পুঁজিবাদ ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করে। এই ব্লগে আমরা ইউরোপে পুঁজিবাদের বিকাশের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আলোচনা করব, যা ইতিহাসপ্রেমী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
ইউরোপে পুঁজিবাদ বিকাশের কারণ:
ইউরোপে পুঁজিবাদ বিকাশের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। নিম্নে সেই কারণগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
১. বণিক শ্রেণির উদ্ভব:
ইউরোপে পুঁজিবাদ বিকাশের একটি অন্যতম কারণ হলো বণিক শ্রেণির উদ্ভব। ব্যবসা-বাণিজ্যে একচেটিয়া মুনাফা লাভের আশায় ইউরোপে Joint Stock Company নামে বণিক শ্রেণি একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে। ইউরোশ জুড়ে এ ধরাদর প্রতিষ্ঠান ও বণিক শ্রেণির উদ্ভব বাণিজ্যিক উন্নতি সাধন করে এবং পুঁজিবাদের উদ্ভব ঘটায়।
২. সমাজতন্ত্রের অবসান:
সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় মানুষকে কৃষি দাসরূপে শোষণীয় জীবনযাপন করতে হতো। ফলে সমাজের মানুষ অতিষ্ঠভাবে জীবন ফাটাত। কৃষকদের শোষণ করে সামন্ত প্রস্তুরা প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক হয়ে বিলাসবহুল জীবন অতিবাহিত করতে থাকে। ইংল্যান্ডের রাজা উইলিয়াম সেলিসবারিতে প্রজাদের এক সভা আহবান করে এবং যে সভায় আইন পাস করা হয় যে কৃষিদাসদের স্বাধীনতা থাকবে। এভাবে সামন্ত প্রভুদের ক্ষমতা নিখিল হয়ে গেল। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরে সামন্তদের প্রভাব কমে যাওয়ায় রাজার প্রভাব বেড়ে গেল এবং জনগণ স্বাধীনভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে লাগল। অনেক সামন্ত প্রভুরাও সক্রিয়ভাবে বিকাশের পথ সুগম করে দেয়।
৩. উপনিবেশ নীতি:
ইউরোপের ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রগতি সাধিত হতে লাগল যখন বিভিন্ন দেশের সাথে যোগসূত্র স্থাপিত হলো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আরম্ভ হলো। ইউরোপ উৎপাদিত দ্রব্য তারা তাদের উপনিবেশগুলোতে বিক্রি করতো এবং উপনিবেশগুলো হতে নামমাত্র মূল্যে কাঁচামাল নিজেদের দেশে আনত। এভাবে ইউরোপীয় ব্যবাসয়ীদের অধীনে আমেরিকা ও এশিয়ার দেশগুলে। উপনিবেশে পরিণত হলো, যা পুঁজিবাদ বিকাশের ভিত্তি আরো মজবুত করে তোলে।
৪. বুর্জোয়া শ্রেণির উদ্ভব:
ইউরোপের কলকারখানা ও যন্ত্র কারখানাগুলোতে যন্ত্রপাতির দ্বারা যখন উৎপাদন বেড়ে গেল এবং তা মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে যাওয়ার ফলে সমাজের কর্তৃত্ব তাদের হাতে চলে যায়। যন্ত্রের ও কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিক ছায়া তায়া যে পণ্য উৎপাদন করতো তা বিক্রি করে যে। মুনাফা পেত সে টাকা নিয়ে আরো কলকারখানা প্রতিষ্ঠা করতো। এডাবে সমাজে এক ধরনের বুর্জোয়া শ্রেণির আবির্ভাব ঘটল। আর এভাবেই ইউরোপে পুঁজিবাদ বিকাশ লাভ করতে থাকে।
৫. উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা:
ইউরোপে পুঁজিবাদ বিকাশের একটি অন্যতম কারণ হলো উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। কারণ ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিকে ত্বরান্বিত করা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। ইউরোগে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পুঁজিবাদের উত্তরণ ঘটে।
৬. আন্তর্জাতিক ব্যবসায় অগ্রগতি:
ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের দেশের জন্য অন্য দেশের দ্রব্যাদি আমদানি করাতা এবং দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত উৎপন্ন দ্রব্য বিদেশে রপ্তানি করতো। এভাবে এক দেশের সাথে অন্য দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হলো। পরবর্তীকালে এভারে সম্রোজ্যবাদের প্রসার হলেও এর ফলে যেসব দেশ নিজের অভদ পুরণ করতে পারত না। যেসব দেশ ইউরোপের উপর নির্ভরশীদ হতে থাকে। ইউরোপের উপর বিভিন্ন দেশের নির্ভরশীলরা ইউরোপে পুঁজিবাদের বিকাশকে সহায়তা করে।
৭. ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার:
পুঁজি সঞ্চয়ে প্রথম ও প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে ব্যবসা-বাণিজোর প্রসায়। ব্যবসা বাশিংজ্যর প্রসার সর্বপ্রথম ইউরোপে ঘটে এবং ইউরোপেই সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক ধনতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে।
৮ কাগজের টাকার প্রচলন:
প্রথমদিকে দ্রব্য বিনিময় প্রথায় মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য করা হতো। পরবর্তীতে প্রধা এক বিক্রয়ের জন্য সোনা রুপা ও লোহার বিনিময় প্রথা প্রচলিত বিরল। এগুলো দূরদেশে বহন করে নেওয়া কষ্টসাধ্য ছিল। যখন বাজারে। কাগজের নোটের প্রচলন শুরু হয় তখন থেকে বিদেশের সংগ ব্যবসা বাণিজ্যের আগতি বাড়তে থাকে। এভাবে ইউয়োগে বণিক শ্রেণি ও ক্ষুদে ব্যবসায়িগণ ব্যক্তিমালিকানায় প্রতি উদ্বুদ্ধ হলো এবং পরিবর্তীকালে সমাজে পুঁজিপতি হয়ে মর্যাদা লাভকরল। এভাবে ইউরোপে পুঁজিবাদের বিকাশে কাগজের মুদ্রার প্রচলন বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
৯. ভৌগোলিক আবিষ্কার ও উপনিবেশ স্থাপন:
ভৌগোলিক আবিষ্কার ও উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে উপনিবেশিক শক্তিগুলো অন্যান্য দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে অর্থ সম্পাদ লুন্ঠন করে নেয়। ফলে ইউরোপের দেশগুলোতে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে।
১০. ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন:
ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন ইউরোপের বিভিন্ন সমাজে সংঘটিত হয়েছিল। তাদের মধ্যে একটি অন্যতম আন্দোলন হলো প্রটেস্ট্যান্ট। ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় সমাজের ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা পুঁজি গঠনে বৈপ্লবিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে সাহায্য করেছিল। ফলে ইউরোপীয় সমাজে পুঁজিবাদের পথ সুগম হয়।
১১. ব্যক্তিগত মালিকানা:
সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থায় ভূমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার উপস্থিতি ইউরোপে পুঁজিবাদের উদ্ভব ও বিকাশের মূল কারণ। এর ফলে কৃষকরা পুঁজি গঠনের সুযোগ পায় এবং পুঁজি বিনিয়োগ করে ক্রমে পুঁজিবাদের দিকে ধাবিত হয়।
১২. শহর ও নগরের বিকাশ:
পুঁজিবাদ বিকাশের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো ইউরোপে দ্রুত শহর ও নগরের বিকাশ। চতুর্দশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপের গ্রামীণ মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহর ও নগরের দিকে ধাবিত হতে লাগল এবং ক্রমান্বয়ে নগর ও শহরের বিস্তৃতি ঘটতে লাগল। বিদেশি পণ্য আমদানি দেশীয় পণ্য রপ্তানি এবং বিদেশিদের সাথে যোগাযোগ গড়ে উঠল। শিল্পবিপ্লবের মাধ্যমে শহর ও নগরের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকল। ফলে পুঁজিবাদ বিকাশের পথ প্রশস্ত হলো।
১৩. কৃষি ও শিল্পবিপ্লব:
বিশ্বব্যাপী কৃষি ও শিল্পবিপ্লবের ফলে উৎপাদনের পরিমাণ বহুগুণে বেড়ে যায়। তখন অনেক দেশ উদ্বৃত্ত পণ্যদ্রব্য বিদেশে রপ্তানি করে পুঁজির সঞ্চয় করে থাকে ইউরোপের দেশগুলো এক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে ছিল। ফলে ইউরোপের দেশগুলোতে পুঁজির সথায় বৃদ্ধি পেয়ে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটতে থাকে।
১৪. অর্থ সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে অবাধ প্রতিযোগিতা:
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তির অর্থ সঞ্চয়ের উপর কোনো বাধা নিষেধ থাকে না। ইউরোপের সমাজেও পুঁজি সঞ্চয়ের উপর কোনো বাধ্য ছিল না, অবাধ প্রতিযোগিতা বিদ্যমান ছিল সামন্ততান্ত্রিক সমাজের অবসানের পর। ফলে দ্রুত পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটতে থাকে।
১৫. উদ্বৃত্ত মূল্য অবাধ শোষণ:
অধিক মুনাফা লাভের আশায় কলকারখানার মালিকগোষ্ঠী শ্রমিকদেরকে তাদের নির্ধারিত শ্রমের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য করে। তাদের উদ্বৃত্ত শ্রমের দ্বারা যে পরিমাণ উৎপাদন করা হতো তা উদ্বৃত্ত মূল্যের সৃষ্টি হেরে। উপরন্তু উদ্বৃত্ত শ্রমের অনুপাতে শ্রমিকদের পর্যাপ্ত মজুরি দেওয়া হতো না। শ্রমিক যত উদ্বৃত মূল্যের সৃষ্টি করে পুঁজিপতিদের দ্বারা শ্রমিক শোষণের মাত্রা তত বৃদ্ধি পায়। এভাবে উদ্বৃত্ত মূল্য ও শ্রমিক শোষণের মাধ্যমে পুঁজিবাদের উদ্ভব ঘটে।
১৬. যুক্তিবাদী রাষ্ট্র এবং এর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি:
পুঁজিবাদ বিকাশের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো যুক্তিবাদী রাষ্ট্র এবং এর কানৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি। সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থার শেষ পর্যায়ে এসে ইউরোপে যুক্তিবাদী রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। সে সময় ইউরোপের দেশগুলোতে সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি হহণ করা হয়, ফলে পুঁজিবাদের দ্রুত বিকাশ ঘটে।
১৭. সামাজিক শক্তির অভ্যুদয় ও সামাজিক শ্রমবিভাগ:
সামন্ততন্ত্রের শেষ পর্যায়ে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে এবং সমাজে কর্ম ও পেশার বৈচিত্র্যতা দেখা যায়, যা পুঁজিবাদ বিকাশের গতিকে ত্বরান্বিত করে।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার শেষে বলা যায় যে, ইউরোপে পুঁজিবাদের বিকাশ একদিনে হয় নি এবং এর জন্য নির্দিষ্টভাবে কোনো একটি কারণ দায়ী নয়। প্রাখমিকভাবে ধর্মীয় বিভিন্ন মতবাদ ও দর্শন পুঁজিবাদের গতিকে বেগবান করলেও পরবর্তীকালে সমসমায়িক বিভিন্ন ঘটনা ও কারণ পুঁজিবাদ বিকাশের পথকে আরো প্রসারিত করে। আর এভাবেই ইউরোপে প্রথম পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে।
আরও পড়ুন- পুঁজিবাদ কাকে বলে ও পুঁজিবাদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যসমূহ।
