সর্বহারা একনায়কতন্ত্র কী? পণ্যের বিনিময় মূল্য কি?
সর্বহারা একনায়কতন্ত্র ও পণ্যের বিনিময়মূল্য তত্ত্ব
ভূমিকা:- কাল মার্কসের যাবতীয় আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু হলো শ্রেণিসংগ্রাম। তিনি ভবিষ্যতবাণী করেছেন যে - পুঁজিবাদের চূড়ান্ত পতনের মধ্য দিয়ে সর্বহারাদের সমন্বয়ে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আধুনিক সাম্যবাদী সমাজের বা রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হবে এবং সেখানে সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
সর্বহারার একনায়কতন্ত্র
শ্রেণি ও শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্ব Marx এর তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি সমগ্র মানব ইতিহাসকে শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস বলেছেন। তাঁর মতে, মানবসমাজ দুটি বিবদমান শ্রেণিতে বিভক্ত। একটি উৎপাদন উপায়ের মালিক এবং অন্যটি উৎপাদন উপায়ের মালিকানা থেকে বঞ্চিত। এতে একশ্রেণি উদ্বৃত্ত ভোগ করে এবং অন্য শ্রেণির উপর প্রভুত্ব করতে সক্ষম হয়। তিনি উল্লেখ করেন যে, সমাজে কখনো মুক্ত মানুষ ক্রীতদাস, অভিজাত, সাধারণ মানুষ, ভূস্বামী, ভূমিদাস এবং কখনো গিল্ড মাস্টার ও কারিগর। এক কথায়, নিপীড়িত ও নিপীড়ক এ দু'শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। শোষণের এক পর্যায়ে শ্রমিক শ্রেণি সচেতন হয় এবং সংগ্রামে লিপ্ত হয়। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজকে Marx বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি এবং সর্বহারা শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন, পুঁজিপতি শ্রেণি কর্তৃক শ্রমিক শ্রেণিকে অত্যধিক শোষণের ফলে সমাজে শ্রেণিসংগ্রাম তীব্রতর হবে। এ অবস্থায় পরস্পর বিচ্ছিন্ন সর্বহারা শ্রেণি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের পতন ঘটিয়ে একনায়কত্ব (Dictatorship of Proletariat) প্রতিষ্ঠা করবে। এর সাথে সাথেই প্রতিষ্ঠিত হবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে ধনতান্ত্রিক সমাজ।
পরিশেষে বলা যায় যে, মার্কস তার শ্রেণিসংগ্রামের আলোচনায় সমাজ বিকাশের প্রতিটি অধ্যায়ে দুটি শ্রেণির অস্তিত্বের কথা বলেছেন। একটি হলো শোষক শ্রেণি অন্যটি হলো শোষিত শ্রেণি। অর্থাৎ ধনী বা পুঁজিপতি এবং গরিব বা সর্বহারা শ্রেণি। সমাজ বিকাশের প্রতিটি ধাপে এই দুটি শ্রেণির মধ্যে দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ বিদ্যমান ছিল বর্তমানেও রয়েছে। মার্কস আশা প্রকাশ করেছেন যে এই এই দুটি শ্রেণীর দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে করার মধ্য দিয়ে সর্বহারা শ্রেণি একসময় জয় লাভ করবে এবং প্রতিষ্ঠা পাবে সর্বহারা তথা গরিবদের একনায়কতন্ত্র।
পণ্যের বিনিময়মূল্য তত্ত্ব
মার্কসের পূর্বে পুঁজিবাদী অর্থনীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডো এবং মূল্যের শ্রমতত্ত্ব গড়ে তোলেন। মূল্যের প্রমতত্ত্ব অর্থনীতি তথা সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পুঁজিবাদ ব্যাখ্যায় একটি অন্যতম প্রত্যয়। সাধারণত কোনো দ্রব্য উৎপাদনে শ্রমিকেরা যে শ্রম দেয় তার ভিত্তিতে বস্তুর মূল্য স্থির করা হয়। এই তত্ত্বকে অবলম্বন করে মার্কস শ্রমের মূল্যতত্ত্ব রচনা করেন। শ্রমের মূল্যতত্ত্বে মার্কস পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার রহস্য উদঘাটন করেছেন।
পণ্যের বিনিময় মূল্য:
কোনো পণ্য উৎপাদন করতে গিয়ে যে শ্রম আবশ্যিকভাবে ব্যয় করার মাধ্যমে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। পণ্য উৎপাদন করতে গিয়ে প্রত্যেকটি পণ্যের প্রকৃত মূল্য সবসময় পাওয়া যায় না। তাই পণ্যের বিনিময় মূল্যের আশায় উৎপাদিত প্রতিটি পণ্যের জন্য ক্রেতা সংগ্রহ করা অত্যন্ত জরুরি এবং তা যত দ্রুত সম্ভব। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহ। পণ্যের চাহিদার পরিমাণ কি এ বিষয়ে উৎপাদকগণকে সঠিক পরামর্শ প্রদান করার মতো কোনো সঠিক সংস্থা কোনো ধরনের সমাজব্যবস্থায়ই খুঁজে পাওয়া যায় না।
শুধু তাই না, উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা, এবং এর পরিমাণ কি হওয়া উচিত এবং কোন ধরনের পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করা উচিত?
তবে, একথা নির্ধিদ্বায় বলা যায় যে, উৎপাদিত পণ্যের একটি বৃহৎ অংশ যতদিন পর্যন্ত ভোগের জন্য উৎপাদিত হয় আর একটি ক্ষুদ্র অংশ বাজারজাত করার জন্য উৎপাদিত হয় ততদিন পর্যন্ত বাজারের ভূমিকা থাকেনা। কিন্তু পণ্যের উৎপাদন যখন ব্যাপক আকারে হয় তখন বাজারজাতকরণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, শ্রমের মূল্যতত্ত্ব বলতে কোনো পণ্যের মূল্যকে বুঝায় যা নির্ধারিত হয় ব্যয়িত শ্রমের পরিমাণ দ্বারা। মার্কস শ্রম ব্যয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রমের মূল্যতত্ত্ব প্রদান করেন। মার্কসের এই তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা থাকার পাশাপাশি অনেক দার্শনিক ও তাত্তিক এর সমালোচনাও করেছেন। সমালোচকরা মার্কসের এই তত্ত্বকে অবাস্তব বলে আখ্যায়িত করেছেন।তাছাড়া পণ্যের বিক্রয়মূল্যকে কেবল ব্যয়িত শ্রম মুল্য দ্বারা নির্ধারিত হয় না বরং আরো অনেক বিষয় রয়েছে পণ্যের মূল্য নির্ধারণে যেগুলো কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

Comments
Post a Comment