ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সমালোচনা কর
ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সমালোচনাসমূহ
ভূমিকা: মার্কসীয় দর্শনের মৌলিক ও প্রধান সূত্রসময়ের মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হল দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। মার্কসবাদী রাষ্ট্রচিন্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এই দ্বন্দ্বমূলক এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। মার্কসবাদীরা মূলত ইতিহাসের ধারা ব্যাখ্যার জন্য এই ঐতিহাসিক বাস্তববাদী ধরনের প্রয়োগ করেন। মানব সমাজের ইতিহাস ব্যাখার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক বাস্তুবাদ ধারণাটি সমাজবিজ্ঞানীগণ বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছেন। সমাজের ইতিহাস ব্যাখ্যায় মার্কসবাদীরা ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এর সমর্থন করলেও অ-মার্কসবাদীদের মধ্যে অনেকেই ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সমালোচনা করে।
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের নিরিখে যে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ প্রতিষ্ঠিত তার প্রতি বিভিন্ন মনীষীর সমালোচনা বর্ষিত হয়েছে। সমালোচকগণ ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সমালোচনা করে যেসব যুক্তি তুলে ধরেছেন নিচে সেগুলো তুলে ধরা হলো।
ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সমালোচনা
১. অর্থনৈতিক উপাদানের উপর অহেতুক গুরুত্বারোপ:
ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সবচেয়ে বড় সমালোচক কার্ল আর পপার বলেন, মার্কস ও তাঁর উত্তরসূরিরা সমাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উপাদানের উপর অহেতুক গুরুত্বারোপ করেছেন। কেবল অর্থনৈতিক উপাদান এককভাবে ইতিহাসের ধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। আদর্শ, ভাবাবেগ, ধর্ম, সংস্কৃতি প্রভৃতি সমাজজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। মার্কসবাদীয়া উপলব্ধি করতে পারেননি, মার্কসবাদ অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদের তত্ত্বে রূপান্তরিত। অর্থনীতির বাইরে এরা কিছু ভাবতে পারে না বলে অর্থনৈতিক উপাদানে অধিক গুরুত্বারোপ করেন।
২. ইতিহাসকে দুইটি বিবদমান শ্রেণির সংগ্রাম বলে আখ্যায়িত করার আন্ত ধারণা:
ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দৃষ্টিকোণ হতে ইতিহাসকে দুইটি বিদ্যমান শ্রেণির সংগ্রামের ইতিহাস বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। ইতিহাসে শ্রেণি সমন্বয়ে বা সহযোগিতার নজির কম নেই। ম্যাকাইভার (Maclver) বলেছেন, ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আলোকে এটা বলা অতিরঞ্জিত হবে যে রাষ্ট্রের ইতিহাস শ্রেণিসংগ্রামের প্রতিক্রিয়া ব্যতীত কিছুই নয় এবং শ্রেণিসংগ্রাম ইতিহাসের প্রত্যক্ষ চালিকাশক্তি।" সমালোচকরা ইতিহাসকে দুটি বিবদমান শ্রেণির সংগ্রামের ফলাফল হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। কেননা মানব ইতিহাস দ্বন্দ্ব-বিরোধ ছাড়াও সহযোগিতা-সম্প্রীতির নজিরও কম নেই।
৩. সার্কসবাদীদের ভিত্তি ও উপরিসৌধের তত্ত্ব অবৈজ্ঞানিক:
মার্কসীয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সমালোচনা করে একদল সমালোচক বলেন, মার্কসবাদীদের ভিত্তি ও উপরিসৌধের তত্ত্ব অবৈজ্ঞানিক। মার্কস ও তাঁর অনুসারীরা বলেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ভিত্তি করে সামাজিক উপরিকাঠামো অর্থাৎ, রাষ্ট্র, সরকার, ধর্ম, সংস্কৃতি গড়ে উঠে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটলে উপরি কাঠামোর পরিবর্তন ঘটে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়াও নতুন মতাদর্শের প্রভাবে নতুন সমাজ গড়ে উঠতে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ
৪. সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লব অপরিহার্য নয়:
মার্কসবাদীরা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ব্যাখ্যায় বলেন, সমাজের পরিবর্তন ঘটাতে বিপ্লব অপরিহার্য। কিন্তু অচরণবাদীরা বলেন, সংস্কারের মামাজিক পরিবর্তন ঘটেছে তা বিপ্লবের মাধ্যমে ঘটেনি। গর্ভাচের মাধ্যমেও সমাজের পরিবর্তন ঘটতে পারে। বর্তমানে রাশিয়ার যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করছে। অর্থাৎ, সমাজবিপ্লবে মার্কসবাদীরা বিপ্লবকে অপরিহার্য মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে তা ঘটে না বাস্তবে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদের এটি একটি বড় দুর্বলতা। কার্যক্ষেত্রে অনুপস্থিত: ঐতিহাসিক বস্তুবাদের প্রবক্তারা উৎপাদন
৫. উৎপাদন ব্যবহার সাথে মানব ইতিহাসের সম্পর্ক কার্যক্ষেত্রে অনুপস্থিত:
ঐতিহাসিক বস্তুবাদের প্রবক্তারা উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে মানব ইতিহাসের যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন কার্যক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। কেরু হান্ট বলেন, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বলতে পারে না কেন একই ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ধরনের সভ্যতা বিকশিত হয়েছে। করেছেন সমালোচকরা। এটি ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আরেকটি দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
৬. প্রমাণহীন ধারণা:
কোলাকাউস্কি ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সমালোচনা করে বলেন, মার্কস ও এঙ্গেলস কোনো প্রমাণ ছাড়াই ইতিহাসকে শ্রেণি কাঠামোর প্রতিফলন এবং শ্রেণি কাঠমোকে সমাজের প্রযুক্তিবিদ্যার উপর নির্ভরশীল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কোলোকাউস্কি একে সন্দেহজনক ও বিপদগামী বলে উল্লেখ করেছেন। অসম্পূর্ণ বলে এর সমালোচনা করেন একদল তাত্ত্বিক।
৭. ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অসম্পূর্ণ:
ঐতিহাসিক বাস্তবাদকে হিসেবে তরা বলেন, উৎপাদনের উপাদানসমূহের পরিবর্তনের মূল উপকরণগুলোর পরিবর্তনের কারণ সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারলে ইতিহাসকে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণের সন্ধান তত্ত্বে পাওয়া যায় না। অপরদিকে উৎপাদনের উপকরণ পরিবর্তনের কারণ সঠিকভাবে ব্যাখ্যা না করতে পারলে ইতিহাসকে যথাযথ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় না।
৮. ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ভবিষ্যদ্ববাণী মানুষকে বিভ্রান্ত করে:
ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সমালোচনা করে কাল আর পপার বলেন, 'মার্কস প্রদত্ত ঐতিহাসিক বস্তুবাদে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী বহু বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে বিভ্রান্ত করে। কারণ তারা মার্কস কে অনুসরণ করে সামাজিক সমস্যা সমাধানে প্রয়াসী হয়েছেন, কিন্তু ইতিহাস সম্পর্কে মার্কসের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হয়নি। একারণেই পপার মার্কসকে 'ভণ্ড পয়গম্বর' বলে আখ্যায়িত করেছেন।
৯. ক্ষমতাশালী মানুষের ত্রুটিপূর্ণ ধারণা:
সমালোচকদের মতে, উৎপাদনের উপাদানসমূহের মালিকানা যেমন মানুষকে ক্ষমতাশালী করে তেমনি বুদ্ধিবৃত্তি, দূরদর্শিতা, সাহস প্রভৃতি গুণাবলির গুরুত্ব এক্ষেত্রে কম নয়। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যিনি বা যারা ক্ষমতাসীন হন তার বা তাদের এই ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক উপাদানের কথা বলা যায় না। আবার মধ্যযুগে পোপের অবিসংবাদিত কর্তৃত্বের কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক উপাদানকে নির্দেশ করা যায় না।
১০. দ্বন্দ্ববাদের সমালোচনা:
বিরুদ্ধবাদী চিন্তাবিদদের মতানুসারে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ভিত্তিতে যে দ্বন্দ্ববাদের কথা বলা হয় তাও সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। ইতিহাসের অবিরাম গতিধারায় 'বাদ' (Thesis), 'প্রতিবাদ' (Antithesis) ও 'স্বস্বাদ' সম্পর্কিত মার্কসীয় ব্যাখ্যা সর্বাংশে সত্য নয়। "Karl Federn বলেন, "History proceeds as 31 Understanding stream of which no one knows the beginning or the end. It provides no tenius a quo and makes it impossible to determine which of its stages are thesis, antithesis or systhesis."
১১. মার্কসবাদের মানবসমাজের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস ব্যাখ্যার সমালোচনা
ঐতিহাসিক বস্তুবাদের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কসবাদের মানবসমাজের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোলাকাউস্কি মানবসমাজের পরিবর্তন সম্পর্কিত এই ব্যাখ্যাকে স্বীকার করেননি। তিনি এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেছেন। তার অনুমত অনুসারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে সমাজের সকল পরিবর্তনের ব্যাখ্যা হিসেবে মার্কসবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। আবার মানব সভ্যতার বিকাশ সংক্রান্ত মার্কসীয় শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব মেনে নেওয়া যায় না। তার মতানুসারে এই পৃথিবীর গ্রহের বিভিন্ন অংশ যুগ যুগ ধরে পরস্পরে সঙ্গে সম্পর্কহীন অবস্থায় কাটিয়েছে। এই বিচ্ছিন্ন অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সারবত্তাকে স্বীকার করা যায় না।
উপসংহার: আলোচনা পরিশেষে বলা যায় যে, কার্ল মার্কস, কোলাকাউস্কি প্রমুখ সমালোচকবৃন্দ মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদের বক্তব্যকে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেননি। মার্কসীয় তত্ত্ব তথা ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে সমালোচনা করার জন্য তাদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ, মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সমালোচনাও যথাযথ নয়। তবে সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ মানবসমাজ ও সভ্যতার ইতিহাস ব্যাখ্যা ও ক্রমবিকাশ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

Comments
Post a Comment