-->

শিক্ষার কার্যাবলি ও গুরুত্ব বিস্তারিত আলোচনা কর

শিক্ষার কার্যাবলি ও গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

ভূমিকা: শিক্ষা ব্যক্তিকে সচেতন, দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলে। শিক্ষা একজন ব্যক্তির মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রতিভাকে বিকশিত করে। শিক্ষার মাধ্যমে সমাজে সুশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায়। সমাজে কোনো যোগ্যতম ব্যক্তিকে বাছাই করার ব্যাপারেও শিক্ষা সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে। শিক্ষা সমাজের ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে দক্ষ করে তোলে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রেই শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।

শিক্ষার কার্যাবলি ও গুরুত্ব আলোচনা

শিক্ষার কার্যাবলিসমূহ

সমাজজীবনে শিক্ষার ভূমিকা সর্বদিক দিয়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে শিক্ষার ভূমিকা বা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কার্যাবলি উল্লেখ করা হলো-

১. সু-প্রবৃত্তি সমূহের বিকাশ সাধন

শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মানুষের প্রকৃতি প্রদত্ত প্রবণতাগুলোকে বিকাশিত করা এবং মানুষের মনের আদর্শ লক্ষকে প্রবিষ্ট করানো। প্রকৃত প্রস্তাবে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের সুপ্ত মানসিক শক্তি বিকাশ সাধন।

২. ত্রুটিপূর্ণ মনোবৃত্তির সংশোধন

শিক্সার অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে শিক্ষার্থীকে সঠিক তথ্য সরবরাহ করা। এ মনোভাব ও মানসিকতার ত্রুটিসমূহ সংশোধন করার কথা বলা হয়।

৩. সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যর বাহন

নাংন্কৃতিক ঐতিহ্যকে শিক্ষা উত্তরপুরুষের মধ্যে সঞ্চারিত করে। সাধারণত শিক্ষাক্রমের অপেক্ষাকৃত উচ্চ পর্যায়েই শিক্ষার এ উদ্দেশ্যকে কার্যকর করার জন্য উল্লেখযোগ্য উদ্দোগ গ্রহণ করা হয়ে থাকে।

৪. প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের সৃষ্টি

স্কুল কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থা হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা। এ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের সুস্থ প্রতিযোগিতার মানসিকতা গড়ে উঠে। এ সুস্থ প্রতিযোগিতার মনোভাব পরবর্তী জীবনেও থেকে যায়।

৫. বৃত্তিগত ভূমিকা

বৈষয়িক ও বৃত্তিগত ক্ষেত্রেও শিক্ষার ভূমিকা বিশেষভোবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিকে জীবিকা অর্জনে সক্ষম নাগরিকরূপে পরিণত করার ব্যাপারে শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম।

৬. রাজনৈতিক কার্যকালাপে অংশগ্রহণ

শিক্ষা সমাজস্থ ব্যক্তিবর্গকে রাজনৈতিক কার্যকালাপে অংশগ্রহণের উপযোগী করে তোলে। এ কারণে শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যেই রাজনীতিক কাজকর্মে অংশগ্রহণের আনুপাতিক হার বেশি হয়ে থাকে।

৭. স্তরবিন্যাসের ক্ষেত্রে ভূমিকা

সমাজের যোগ্যতম ব্যক্তিবর্গকে বাছাই করার ব্যাপারে শিক্ষা সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। তার ফলে সমাজে অধিকতর যোগ্য ব্যক্তিগণ সমগ্র সমাজ ও সমাজবাসীর স্বার্থে কার্যকর ও অর্থবহ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

৮. নৈতিক ও চারিত্রিক গঠন:

শিক্ষার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির নৈতিকতা, আদর্শ, সততা, দায়িত্ববোধ ও ন্যায়বিচারের চেতনা গড়ে ওঠে। এটি তাকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হয়।

৯. সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় সহায়তা:

শিক্ষা ব্যক্তিকে সমাজের নিয়ম, রীতি, প্রথা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে একজন মানুষ ধীরে ধীরে সামাজিক জীবনে আত্মস্থ হয়।

১০. জাতীয় ঐক্য ও সম্প্রীতির উন্নয়ন:

শিক্ষা দেশের নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা, ধর্মীয় সহাবস্থান ও জাতীয় ঐক্যের চেতনা জাগ্রত করে। এটি একটি সুসংগঠিত ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

১১. শিক্ষার সামাজিক প্রভাব

শিক্ষা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নয়, বরং সমাজের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষিত সমাজে সুশাসন, শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সামাজিক মূল্যবোধ, ন্যায্যতা, সমতা এবং মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়, যা একটি সুস্থ সমাজ গঠনে সহায়ক হয়।

১২. প্রযুক্তির শিক্ষা

বর্তমানে, আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষার সাথে যুক্ত হয়ে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল মাধ্যমের মাধ্যমে শিক্ষা প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজতর হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা অনলাইনে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, যা তাদের দক্ষতা এবং জ্ঞান বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। তাছাড়া, প্রযুক্তি শিক্ষা যুব সমাজের মধ্যে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে।

১৩. মানবাধিকার শিক্ষা

শিক্ষার মাধ্যমে মানবাধিকার, বিশেষ করে শিশু, নারী, এবং প্রান্তিক জনগণের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা যায়। এটি একটি সমাজের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা ব্যক্তিকে তার মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে এবং সেগুলোর জন্য লড়াই করার শক্তি দেয়।

১৪. শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন

শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নত হয় এবং এর সাথে সম্পর্কিত থাকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নও। শিক্ষিত জনসংখ্যা দক্ষ কর্মী হিসেবে কাজ করে, যারা দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। তাছাড়া, উচ্চ শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ বিভিন্ন শিল্পের উন্নতির জন্য অপরিহার্য, যা দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে অবদান রাখে।

১৫. বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চ শিক্ষা

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষা কেবল একটি চাকরি বা জীবিকা অর্জনের জন্য নয়, বরং এটি একটি ব্যক্তি বা সমাজের সামগ্রিক চিন্তাধারা ও চিন্তা-চেতনা বিকাশে সাহায্য করে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মাধ্যমে গবেষণা, সৃজনশীলতা, এবং নতুন চিন্তা-ভাবনা সৃষ্টি হয়, যা সমাজে পরিবর্তন আনে। এছাড়া, এটি একটি ব্যক্তি এবং তার পরিবারের সামাজিক মর্যাদাও বৃদ্ধি করে।

পরিশেষে বলা যায় যে, মানব জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। একজন অশিক্ষিত লোকের চেয়ে একজন শিক্ষিত লোকের আচার ব্যবহার ভিন্ন হয়ে থাকে। ব্যক্তিকে জীবিকা অর্জনে সক্ষমে নাগরিকরূপে পরিণত করার ব্যাপারে শিক্ষায় ভূমিকার গুরুত্ব অপরিসীম।

নবীনতর পূর্বতন