সমালোচনাসহ মার্কসের শ্রমের মূল্যতত্ত্বটি আলোচনা কর

সমালোচনাসহ মার্কসের শ্রমের মূল্যতত্ত্বটি আলোচনা

ভূমিকা: উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের চালিকাশক্তি। মার্কসীয় দর্শনের চতুর্থ মৌলনীতি হলো এ উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব। উনিশ শতকের পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থায় শ্রমিক শেষণের প্রকৃতি এবং কীভাবে শোষণ অব্যাহত থাকে সে সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে এই তত্ত্বে। আর এই তত্ত্বের যাখ্যা করতে গিয়ে যেসব মুখ্য বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে তর মাধ্য শ্রম অন্যতম।

কার্ল মার্কসের শ্রমের মূল্যতত্ত্ব

শ্রমের সংজ্ঞা

Karl Marx মানুষের ক্রিয়াকলাপকেই শ্রম হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জনসাধারণের যে সংশ্লিষ্টতা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সচল ও গতিশীল রাখে তাকেই শ্রম বলা হয়। ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ধারণায় মানুষই একমাত্র প্রাণী যে সৃজনশীল শ্রম ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর মতে, ব্যক্তি তার শ্রমের মাধ্যমে ধাতব পরিবেশ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ঐতিহাসিক প্রয়োজনে একটি সমাজিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলে। তিনি মনে করেন, শ্রমই হলো সমাজের অস্তিত্ব ও বিকাশের মূলশক্তি। সেজন্য মার্কস সম্পদকে শ্রমের জনক বলে অভিহিত করেছেন।

শ্রম প্রয়োগের মাধ্যমেই ব্যক্তি তার পরিবেশকে পরিবর্তন করে, মানুষ হিসেবে তার নিজের ক্ষমতা ও সৃজনশীলতা সম্পর্কে সচেতন হয়। মানুষের চাহিদাই তাকে সৃজনশীল হতে বাধ্য করে। আর মানুষ তার সৃজনশীল শ্রমশক্তির ব্যবহার করে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্য দিয়ে উৎপাদনব্যবস্থার সৃষ্টি ও স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করে। যেহেতু মানুষ সৃজনশীল শ্রম শক্তির অধিকারী, উৎপাদন প্রক্রিয়া ও সৃজনশীলতায় অভিব্যক্তি তাই সমাজব্যবস্থার রূপান্তরের প্রশ্নটি উৎপাদনব্যবস্থার বিকাশের বিক্রিয়ার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সুতরাং বলা যায় উৎপাদন হলো মানুষের নিরঞ্জন সংগ্রামের ফল আর Karl Marx উৎপাদনের প্রধান উপকরণ শ্রমকে প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা উপরিউক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়।

বিশেষ সামাজিক সম্পর্ক ও শোষণ হিসবে শ্রমমূল্য তত্ত্ব বা মার্কসের শ্রমের মূল্যতত্ত্ব:

মানুষ যেহেতু এককভাবে উৎপাদন করতে সক্ষম নই তাই উৎপাদনের স্বার্থেই এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির সঙ্গে মিলিত হতে বাধ্য হয়। ফলে, উৎপাদনকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে এক প্রকার উৎপাদন সম্পর্ক (Relations of production) গড়ে ওঠে। প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের লক্ষ্যে মানুষ সম্মিলিতভাবে শ্রমশক্তি প্রয়োগ করে এবং এরই ফলশ্রুতিতে পরস্পরের সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। কিন্তু এ সম্পর্ক নির্ধারিত হয় বিষয়গতভাবে উৎপাদনের সামাজিক বা সমষ্টিগত প্রয়োজনে, ব্যক্তিমানুষের ইচ্ছা নিরপেক্ষভাবে।

প্রতিটি সমাজের উৎপাদন সম্পর্ক হলো একটি জটিল সামগ্রিক অবস্থা, যা গঠিত হয় উৎপাদন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত মানুষের সম্পর্ক, বিভিন্ন প্রকার সামাজিক শ্রমবিভাজন ও দ্রব্যাদি বণ্টনের বিচিত্র ব্যবস্থার দ্বারা। এসব সম্পর্কের বিচিত্রতা প্রকাশ পায় বিশেষ ঐতিহাসিক সমাজের সম্পত্তি কাঠামোর আদলের মধ্যে। অর্থাৎ, উৎপাদিকাশক্তিগুলো যদি মুষ্টিমেয় ব্যক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে উৎপাদন সম্পর্ক হয় বৈরদ্বান্দ্বিক। উৎপাদিকাশক্তিগুলোর মালিকানার স্বরূপ নির্ধারণ করে উৎপাদন-সম্পর্কের আর্থসামাজিক চরিত্র, যা থেকে জন্ম নেয় বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর সম্পর্ক। বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কগুলোও উৎপাদন, সম্পর্ক ধারণাটির অন্তর্ভুক্ত।

সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষের তথা শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে বিরাজমান উৎপাদন সম্পর্ক অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সহজবোধ্য কিন্তু পণ্য উৎপাদন প্রথায় মানুষের মধ্যে বিরাজমান উৎপাদন সম্পর্ক বিভিন্ন বস্তুর মধ্যকার সম্পর্ক হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। একজন মুচি যখন তার প্রস্তুতকৃত এক জোড়া জুতা বিক্রি করে এ আয়ের অর্থ দ্বারা তার নিজের ও নিজ পরিবারের জন্য কটিওয়ালার কাছ থেকে কটি ক্রয় করে তখন মানুষের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট উৎপাদন-সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়। একদিকে রুটিওয়ালার তৈরি রুটি মুচি ও তার পরিবারের সদস্যদের চাহিদা পুরণ করে, অন্যদিকে মুচির তৈরি জুতা ক্ষেত্রবিশেষে রুটিওয়ালার কাছে পৌঁছে যাবে। এ উদাহরণ থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, মুচির চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজন রুটিওয়ালার কাজ, আবার রুটিওয়ালার চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজন মুচির শ্রম। সুতরাং মুচি ও রুটিওয়ালার মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট যোগাযোগ এবং উৎপাদন অনুসারে একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে কিন্তু সমাজতান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রতিটি শ্রমিকের নিকট অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, সে হলো এক সংগঠিত সমাজদেহের অঙ্গ। এই সম্পর্ক বা যোগাযোগ প্রকাশ পায় বিনিময় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। পণ্য এমন একটি বস্তু, যা এক উৎপাদকের নিকট থেকে অন্য উৎপাদকের নিকটে যায়। রুটিওয়ালার নিকট থেকে রুটি যেমনি যায় মুচির নিকট ঠিক তেমনি মুচির নিকট থেকে জুতা যায় ব্যবসায়ীর নিকট, অতঃপর সেখান থেকে আবার যায় রুটিওয়ালার নিকট কিন্তু উৎপাদিত পণ্য শুধু শুধুই হস্তান্তরিত হয় না। মুচি তার তৈরি জুতা কেবল তখনই হস্তান্তর করে যখন সেগুলোর পরিবর্তে সে উপযুক্ত মূল্য পায়। রুটিওয়ালা ও অনুরূপ কাজ করে। এভাবে পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানুষের মধ্যে একধরনের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। মার্কসই সর্বপ্রথম দেখিয়েছেন যে, মূল্য হলো পণ্য উৎপাদনব্যবস্থায় মানুষের সাথে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক।

উৎপাদনব্যবস্থা যেহেতু প্রধানত নির্ভর করে সেই স্তরের উৎপাদন শক্তির ওপর, বিশেষ করে উৎপাদনের বিনিমিয়ে আবশ্যকীয় যন্ত্রাদির ওপর, সেহেতু উৎপাদন সম্পর্ক মানুষের সঙ্গে তার উৎপাদনের উপকরণের সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল এবং তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু এই উৎপাদনের উপকরণগুলো যদি মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির কুক্ষিগত হয়, তবে উৎপাদন-সম্পর্কটি অবশ্যই হবে বৈরদ্বান্দ্বিক। কারণ, উৎপাদন-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে উৎপাদন-উপকরণের মালিক বনাম এই উৎপাদনে অংশগ্রহণকারী শ্রেণির মধ্যে। এককথায়, উৎপাদনে-উপকরণের মালিকানার স্বরূপ নির্ধারণ করবে উৎপাদন-সম্পর্কের সামাজিক, অর্থনৈতিক চরিত্রটিকে, যা থেকে জন্ম নেবে বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর সম্পর্ক।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, শ্রম হলো মানুষের সামাজিক কর্মের ভিত্তি। শ্রমের মধ্যেই এবং শ্রমের মাধ্যমেই মানুষ তার প্রত্যক্ষকরণের পরিধি বিস্তৃত করে এবং চিন্তা ও ভাষাকে উন্নত করার জন্য মানুষ তার মাথা খাটাতে আরম্ভকরে। অতএব, শ্রমের মধ্যেই চিন্তার মূল উৎস নিহিত। সমস্ত মানবিক অস্তিত্বের প্রাথমিক মৌল শর্ত হলো সামাজিক শ্রম ও সামাজিক চিন্তা, যা কার্ল মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্বের মাধ্যমে আমাদের সামনে প্রকাশিত হয়েছে।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন