ভাববাদ কী? ভাববাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ লেখ
ভূমিকা: সমাজতত্ত্ব ও দর্শনের কেন্দ্রীয় প্রত্যয়গুলোর মধ্যে ভাববাদ (Idealism) অন্যতম। মানব সভ্যতার চিন্তাধারার ইতিহাসে ভাববাদ একটি প্রাচীন ও প্রভাবশালী মতবাদ। এই মতবাদের মূলকথা হলো জগতের সকল সত্তার ভিত্তি হলো মন বা চেতনা। অর্থাৎ, মন বা জ্ঞানই প্রথম এবং প্রধান। ভাববাদীদের মতে, বস্তুর অস্তিত্ব এককভাবে সম্ভব নয়; বরং বস্তুর অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে মন বা জ্ঞানের ওপর। মন বা চেতনা নিরপেক্ষ কোনো সত্তার অস্তিত্ব এই দর্শনে স্বীকৃত নয়। যেমন আমাদের চিন্তা, অনুভূতি বা কল্পনার মননিরপেক্ষ কোনো অস্তিত্ব নেই, ঠিক তেমনি বাইরের জগতের বস্তুরও মননিরপেক্ষ কোনো স্বতন্ত্র সত্তা নেই।
ভাববাদ:
যে দার্শনিক মতবাদে বিশ্বাস করা হয় যে বিদ্যমান বাস্তবতা বা যাকে আমরা বাস্তবতা ভাবি তা আসলে মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক এবং তা মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিকভাবে নির্মিত, সেই মতবাদকে ভাববাদ বলা হয়। এই মতবাদ অনুসারে বিশ্বাস করা হয় যে-কোনো বিষয়ের বস্তুগত অস্তিত্ব অর্জনের প্রাথমিক পূর্বশর্ত হলো মনোজাগতিক চৈতন্যের পর্যায়ে ঐ নির্দিষ্ট বিষয়ের অস্থিত্ব অনুভূত হওয়া। অর্থাৎ, কোনো বস্তুর বাস্তবিক অস্তিত্ব প্রথমে ব্যক্তির চৈতন্যের পর্যায়ে অনুভূত হয়। যদি চৈতন্যের পর্যায়ে বস্তুর বাস্তবিক অস্তিত্ব অনুভূত না হয় তাহলে নী বস্তুব কোনো অস্তিত্বই নেই। যদি কোনো বস্তুর বস্তুগত অস্তিত্ব থাকে কিন্তু চৈতন্যের পর্যায়ে তা অনুযুক্ত না হয় তাহলে তার কোনো বস্তুগত অস্তিত্ব থাকবে না বলে এই মতবাদে বিশ্বাস করা হয়। অর্থাৎ, চৈতন্যের মধ্যে অনুভব এখানে বস্তুর অস্তিত্বের জন্য অত্যাবশ্যক। তবে চৈতন্য সবকিছুর পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করবে। অর্থাৎ, চৈতন্য ও বন্ধ্যা অস্তিত্ব দুইটি পারস্পরিক বিষয়। চৈতন্যের প্রেক্ষিতে বস্তুর অস্তিত্ব স্বীকৃত হলেও বস্তুর অস্তিত্ব স্বীকৃত হয়ে যাবার পরে আর চৈতন্যের সাথে বস্তুর কোনো সম্পর্ক থাকে না বলে এই তলে মনে করা হয়।
ভাববাদ শব্দের উৎপত্তি ও ইতিহাস
'ভাববাদ' বা 'Idealism' শব্দটি গ্রিক শব্দ 'idein' থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যার অর্থ হলো 'দেখা' (To see)। দর্শনের পাতায় প্লেটোকে ভাববাদের আদি পুরুষ বলা হলেও, রাজনৈতিক ও সাধারণ অর্থে 'Idealism' শব্দটির প্রয়োগ পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ১৯৪৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ বিষয়ক বক্তৃতায় 'Idealism' শব্দটি একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহার করেছিলেন।
ভাববাদের বৈশিষ্ট্য:
নিম্নে ভাববাদের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরা হলো-
১. কোনো দৃশ্যমান বস্তুর বস্তুগত অস্তিত্ব প্রথমে ব্যক্তির মনোজগতে অনুভূত হতে হয় বলে এই মতবাদে মনে করা হয়।
২. এই মতাদর্শে মনে করা হয়, যদি বস্তুর দৃশ্যমান অস্তিত্ব ব্যক্তির চৈতন্যে অনুভূত না হয় তাহলে মনে করা হয় যে বস্তুটির কোনো বাস্তবিক অস্তিত্ব নেই।
৩. বস্তুর অস্তিত্ব বিষয়ে ভাববাদী দর্শনের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে বস্তুবাদ' বা জড়বাদ উদ্বৃত হয়। অনেক সময়ে ভাববাদ বা idealism-এর বিপরীতে বস্তুবাদ বা materialism-কে দাঁড় করানো হয়।
৪. এই মতাদর্শে বস্তুর অস্তিত্বকে অনুভবকারী ব্যক্তিকে অস্তিত্ববাদী মতাদর্শের ধারক বা Passiver হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
৫. ব্যক্তির অভিজ্ঞতা, চৈতন্য এবং তার অনুভব করার শক্তি এই দ্রীবিধের সম্মেলনে এখানে ব্যক্তির মধ্যে বস্তুকে ধারণ করার মতো মনস্তাত্বিকতা তৈরি হয় বলে মনে করা হয়।
৬. বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাববাদী দার্শনিকের আলোচনার প্রেক্ষিতে তাত্ত্বিকদের বিভিন্ন ধরনের ভাববাদী দর্শনের কথা বিভিন্ন সময়ে বলা হয়, যেমন- বস্তুসাপেক্ষ ভাববাদ বা Subjective idealizm, বস্তুনিরপেক্ষ ভাববাদ বা objective idealism.
উপসংহার: ভাববাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ধারণা, মতবান, গণচেতনা ইত্যাদিকে সমাজ বিকাশের মূল শক্তিরূপে বিবেচনা করা হয়। ভাববাদী বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি বা দর্শনের বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি বা দর্শন হলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ তথা মার্কসীয় দর্শন।
