শ্রেণিসংগ্রামের সংজ্ঞা দাও। শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বের বৈশিষ্ট্য ও প্রকারভেদসমূহ
ভূমিকা: কার্ল মার্কসের তাত্ত্বিক অলোচনার ভিত্তি হলো শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্ব। কারণ শ্রেণি ও শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বটি মার্কসীয় রাজনীতি ও সমাজতাত্ত্বিক দর্শনের এক উজ্জ্বল দিক বা চিহ্ন। এই শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বকে কেন্দ্র করেই মার্কসীয় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রভৃতি দর্শন গড়ে উঠেছে। আর এ শ্রেণিসংগ্রামের মধ্যেই পরিচয় পাওয়া যায় শ্রেণিদ্বন্দ্বের।
শ্রেণিদ্বন্দ্ব বা শ্রেণিসংগ্রাম:
শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বের ব্যাখ্যায় মার্কস পাঁচটি আর্থসামাজিক ধাপের কথা উল্লেখ করেন, যেগুলোতে উৎপাদিকাশক্তি তড়িৎপাদন সম্পর্কে বৈষম্যমূলক বিকাশ থেকে শ্রেণিদ্বন্দ্বের জন্ম হয়। আর এগুলো হচ্ছে- (১) আদিম সাম্যবাদী সমাজ, (২) দাস সমাজ, (৩) সামন্ত সমাজ, (৪) পুঁজিবাদী সমাজ এবং (৫) সমাজতান্ত্রিক সমাজ।
মার্কসের মতে, আদিম সাম্যবাদী সমাজ এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ ছাড়া বাকি সমাজগুলোতে দুটো পরস্পরবিরোধী শ্রেণি গড়ে ওঠে এবং শ্রেণিসংগ্রাম অনিবার্য হয়ে ওঠে। দাস সমাজের দুটি শ্রেণি তথা দাসমালিক ও দাস প্রথম দিকে দ্বন্দ্বহীন থাকলেও শেষ পর্যন্ত উৎপাদনশক্তির বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সামন্ত সমাজে সামন্তপ্রভু ও ভূমিদাসের শ্রেণিদ্বন্দ্বে সামন্ত সমাজ ভেঙে পড়ে এবং জন্ম হয় পুঁজিবাদী সমাজের। আর পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজিবাদ বিকাশের সাথে সাথে শ্রেণিদ্বন্দ্ব শ্রেণিসংগ্রামে রূপ নেয় এবং নতুন সমাজব্যবস্থার বিকাশ ঘটে।
Marx-এর মতে, সমাজে শ্রেণির সূত্রপাত ঘটার সাথে সাথেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হয় এবং স্বাভাবিকভাবেই শ্রেণিদ্বশ্বের উৎপত্তি হয়। আর, শ্রেণিভুক্ত মানুষ তার নিজস্ব স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। এই শ্রেণি সচেতনতা মানুষকে শ্রেণিস্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট করে তোলে। কেননা তার নিজের অবস্থানও কেবল তখনই নিশ্চিত হতে পারে। শ্রেণিস্বার্থ সংরক্ষণের সচেতনতা, থেকেই পরবর্তীতে শ্রেণিদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। কতগুলো ধাপ পেরিয়ে শ্রেণিদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। যথা: Class > Class consciousness > Class conflict সুতরাং বলা যায়, শ্রেণিদ্বন্দ্ব আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। যখন শ্রমিকশ্রেণি বুঝতে পারে তাদের উদ্বৃত্তমূল্য থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে তখনই তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে শ্রেণিদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
শ্রেণিদ্বন্দ্ব বা শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বের বৈশিষ্ট্য:
মার্কসীয় দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে থাকা সমাজতত্ত্বের একটি বিশেষ তত্ত্ব বা মতবাদ হচ্ছে শ্রেণিসংগ্রাম-সংক্রান্ত মতবাদ। মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে যুগ যুগ ধরে সমাজে শ্রেণিসংগ্রাম অব্যাহতভাবে চলে আসছে। এ সংগ্রাম কখনো স্পষ্ট আবার কখনো অস্পষ্ট, কখনো তীব্র কখনো বা সরল, আবার কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো পরোক্ষভাবে অব্যাহত থাকে। তাঁর মতে, এই শ্রেণিসংগ্রাম এরই পরিপ্রেক্ষিতে শ্রেণিসংগ্রাম শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজ কায়েম না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত গতিতে চলতেই থাকবে। তত্ত্বের কতিপয় বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। যথা:
১. নির্দিষ্ট শ্রেণির সদস্যতা:
কার্ল মার্কসের শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বে প্রতিটি শ্রেণির সদ্যসগণ নিজেদেরকে ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা না করে তাদেরকে নিজ নিজ শ্রেণির সদস্য হিসেবে চিন্তা করে।
২. বিপ্লবের আবশ্যকতা:
শ্রেণিসংগ্রামে পুঁজিপতির সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাবে এবং প্রলেতারিয়েত শ্রেণির সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এই দুই শ্রেণির মধ্যে দ্বন্দ্বের সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং পরিশেষে প্রলেতারিয়েতদের বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিপতিদের ধ্বংস অনিবার্য হবে।
৩. সামাজিক পরিবর্তন:
বিপ্লবের মাধ্যমে যখন শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন তারা হবে উৎপাদনের মালিক আর রাষ্ট্র তাদের স্বার্থ রক্ষার অস্ত্রে পরিণত হবে। ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হবে।
৪. রাষ্ট্রের অবলুপ্তি:
মার্কসের ধারণা অনুযায়ী, সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে তথা শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে এবং সর্বহারাশ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা হলে রাষ্ট্রের আর কোনো প্রয়োজনই থাকবে না। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটবে।
৫. শ্রেণিসচেতনতা:
কার্ল মার্কসের শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল না কিন্তু আধুনিক যে শ্রেণিবিভাগ, তাতে প্রতিটি মানুষেই তার শ্রেণি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন।
৬. নেতির নেতিকরণ:
মার্কস তাঁর শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বের ব্যাখ্যায় Thesis, Antithesis এবং Synthesis শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন এবং এগুলোর পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের বা রূপান্তরের মাধ্যমে নেতির নেতিকরণ সম্পর্কে আমাদের ধারণা দেন।
৭. মৌল ও উপরিকাঠামো:
মার্কস তাঁর শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বে মৌল ও উপরিকাঠামো সম্পর্কে ধারণা প্রদান করেন। তিনি অর্থনৈতিক কাঠামোকে মৌলকাঠামো এবং এর ওপর নির্ভরশীল মতাদর্শ, আইন, চিন্তা, দর্শন, শিল্প ইত্যাদিকে উপরিকাঠামোকে বলেছেন। পরিশেষে বলা যায়, উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ শ্রেণিসংগ্রামকে অন্যান্য তত্ত্ব থেকে পৃথক ও স্বমহিমায় মহিমান্বিত করেছে, যা বর্তমান বিশ্বায়ন ও শিল্পায়নের যুগে আজো প্রাসঙ্গিক। তাই এ তত্ত্বের গুরুত্বকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
শ্রেণিসংগ্রামের প্রকারভেদ:
সমাজ থেকে বৈষম্য তুলে দিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই হলো কার্ল মার্কসের দর্শনের মূল লক্ষ্য। আর এই লক্ষ্য অর্জনের বিশেষ উপায় হচ্ছে তাঁর শ্রেণিসাগ্রাম তত্ত্ব। শ্রেণিসংগ্রাম হলো মূলত বৈরী স্বার্থসম্পন্ন শ্রেণিদের মধ্যে সংগ্রাম। শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বে কার্ল মার্কস সমাজের শোষিতশ্রেণিকে শোষকশ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ করেছেন। কার্ল মার্কসের মতে, শ্রেণিসংগ্রাম প্রধানত তিন ধরনের। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
অর্থনৈতিক শ্রেণিসংগ্রাম:
সকল প্রকার শ্রেণিসংগ্রামের মধ্যে অর্থনৈতিক শ্রেণিসংগ্রামই সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক সংগ্রাম হলো অর্থনৈতিক বিভিন্ন দাবিদাওয়া আদ্যয়ের সংগ্রাম, যার মধ্য দিয়ে শ্রেণি ঐক্য সূচিত হয়। এই নাবি দাওয়ার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মজুরি বৃদ্ধির দাবি শ্রমসময় হ্রাসের দাবি, কাজের পরিবেশের উন্নতি সাধনের দাবি ইত্যাদি। এসব দাবির ভিত্তিতে সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামকেই বলা হয় অর্থনৈতিক সংগ্রাম।
রাজনৈতিক শ্রেণিসংগ্রাম:
গুরুত্বের বিচারে রাজনৈতিক শ্রেণিসংগ্রামের স্থান সবার ওপরে। বিপ্লবের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য শ্রমিকশ্রেণি যে আন্দোলনের সূত্রপাত করে তা চূড়ান্ত রূপ নেয় রাজনৈতিক সংগ্রাম বা আন্দোলনে। তাই মার্কস পরিষ্কারভাবে বলেন যে, সংগ্রামের কারণ যাই হোক না কেন এর প্রধান লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল। তাই বলা যায়, শ্রেণিসংগ্রামের সৃষ্টি অর্থনীতিক কারণে আর এর পরিসমাপ্তি ঘটে রাজনৈতিক সংগ্রামে।
মতাদর্শগত শ্রেণিসংগ্রাম:
মতাদর্শগত শ্রেণিসংগ্রাম হলো শ্রেণিসংগ্রামের আরেকটি রূপ। মতাদর্শগত শ্রেণিসংগ্রাম শ্রমিক শ্রেণিকে সচেতন করে তোলে বিধায় এ প্রলেতারিয়েত সংগ্রামের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। অধিকন্তু অনেক সময় শ্রেণিসংগ্রামকে দীর্ঘায়িত করার প্রয়োজনীয়ত দেখা দেয়। আর সে পরিস্থিতিতে মতাদর্শগত শ্রেণিসংগ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, হাজ দর্শনের মূল আলোচ্য বিষয়ই হচ্ছে শ্রেণিসংগ্রাম সম্পর্কিত ধারণা। জা তাই কার্ল মার্কস অত্যন্ত যত্নসহকারে তার এ তত্ত্ব উপস্থাপন আসি। যেখানে তিনি শ্রেণিসংগ্রামের কারণের পাশাপাশি শ্রেণিসংগ্রামের বৈশিষ্ট্য ও শ্রেণিসংগ্রামের প্রকারভেদও আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন? যা উপরিউক্ত আলোনার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়।
