বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পদক্ষেপসমূহ
বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পদক্ষেপেসমূহ আলোচনা
ভূমিকা: নারী নির্যাতন বর্তমান সময়ের একটি বহুল আলোচিত প্রত্যয়। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, কর্মক্ষেত্রে সর্বত্রই নারীর নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়, বরং এখানের অবস্থা আরো ভয়াবহ। আমাদের সমাজের সকল ক্ষেত্রেই নারীরা অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার। শহর-গ্রাম নির্বিশেষে নারী নির্যাতন হওয়ার ঘটনা সর্বত্র বিরাজমান, যা বর্তমানে আমাদের অন্যতম জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পদক্ষেপসমূহ
নারী নির্যাতন বাংলাদেশে একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না, বরং দেশ ও জাতির কন্যাদের জন্য নারী নির্যাতনের রোধ করা একান্ত জরুরি। নিম্নে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করণীয় বিষয়সমূহ আলোচনা করা হলো-
১. নারীর ক্ষমতায়ন:
নারীর ক্ষমতায়ন হলো নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সবচেয়ে উত্তম পদক্ষেপ। কেননা নারীর ক্ষমতায়ন বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক সম্পদের উপর নারী অধিকার অধিকতর প্রতিষ্ঠা করে। ফলে নারী পুরুষের বৈষম্য হ্রাস পায়, যা নারী নির্যাতনকেও হ্রাস করে। আর তাই নারী নির্যাতন প্রতিরোধের লাক্ষ্যে নায়ীর ক্ষমতায়ন একটি অন্যতম উপায় হিসেবে বিবেচিত, বিশেষত উন্নয়ন দেশগুলোতে।
২. নারীশিক্ষার বিস্তার:
নারীশিক্ষার ব্যাপক বিস্তার নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ কার্যকরী হতে পারে। কেননা একজন শিক্ষিত, সচেতন নারী তার অধিকার সম্পর্কে যেমন সচেতন, তেমনি শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সে হতে পারে স্বাবলম্বী। ফলশ্রুতিতে যেকোনো ধরনের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ও সে প্রতিবাদ করতে সক্ষম হয়। তাই নারী নির্যাতন রোধে নারী শিক্ষা বিস্তার অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে।
৩. দারিদ্র্য দূরীকরণ:
অর্থনৈতিক পুরুষের ওপর নির্ভরশীলতা নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ। অর্থনৈতিক দিক থেকে নির্ভরশীল একজন নারী পুরুষের নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য হয়। তাই নারীর দরিদ্রতা দূর করতে হবে। কেননা গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে নারীর দরিদ্রতার হার কম সে-দেশে নারীর নির্যাতনের মাত্রাও কম। সুতরাং নারীসমাজের দরিদ্রতা দূর করা নদী নির্যাতন রোধে একটি ভালো পদক্ষেণ হতে গায়ে।
৪. ধর্মীয় গোঁড়ামির পরিবর্তন:
আমাদের দেশে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অপব্যাখ্যার জন্য নারীদেরকে নির্যাতিত হতে দেখা যায়।তাই নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করতে হলে ধর্মীয় গোঁড়ামির পরিবর্তন দরকার। এজন্য জনগনকে শিক্ষিত ও সচেতন করে তুলতে হবে যাতে তারা ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে ও বুঝতে পারে।
৫. যৌতুকপ্রথার উচ্ছেদ:
আমাদের দেশে অধিকাংশ নারী নির্যাতন ঘটনার মূলে থাকে যৌতুক। আমাদের দেশে আইনগতভাবে যৌতুক নেয়া ও দেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ আইন থাকা সত্তেও যৌতুক আদান-প্রদান ও যৌতুককে কেন্দ্র করে নারী নির্যাতন বন্ধ হয়নি। তাই যেকোনো মূল্যে যৌতুকপ্রথা উচ্ছেদ করতে হবে। তাহাসই নারী নির্যাতন অনেকাংশে হ্রাস পাবে। আর। এজন্য সরকার জনসচেতনতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ।
৬. ফতোয়া বন্ধ করা:
ফতোয়া আমাদের দেশে নারী নির্যাতনে অন্যতম হাতিয়ার। তাই নারী নির্যাতন রোধে ফতোয়া পূর্ণাঙ্গভাবে বন্ধ করা একটি অত্যন্ত কার্যকরী পদক্ষেপ বিবেচিত হতে পারে। যদিও ২০০১ সালে হাইকোর্ট ফাতোয়া অবৈধ ঘোষণা করছে তথাপি ফতোয়া বন্ধ হয়নি। তাই ফতোয়া বন্ধের জন্য জনগণকে সচেতন হতে হবে এবং ফতোয়াবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হবে।
৭. নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরবির্তন:
আমাদের সমাজে নারীর প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা যায়, যা আমাদের দেশে নারী নির্যাতন অন্যতম কারণ। তাই নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ব্যতীত কেবল আইন করে নারী নির্যাতন রোষ করা সম্ভব নয়। এজন্য নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আর সেজন্য শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।
৮. নারীর অর্থনৈতিক সুবিধা বৃদ্ধি:
নারী অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী না হলে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই নারীর জন্য কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে একটি কার্যকরী পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হতে পারে।
৯. নারী ও শিশুপাচার রোধ:
বাংলাদেশে প্রতি বছর ১০-২০ হাজার নারী ও শিশু পাচার হয়। আর এ নারী ও শিশুপাচার আমাদের দেশে নারী নির্যাতনের একটি বিশেষ ধরন। তাই নারী ও শিশুপাচার রোধে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ ও যথাযথ বাস্তবানে অত্যন্ত কার্যকরী একটি পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হ্যাত পারে।
১০. নারী সচেতত্ত্বতা বৃদ্ধি:
নারী নির্যাতনের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নারী তার অধিকার সম্পর্কে অসচেতন বসেই নির্ঘাতিত হয়ে থাকে। সুতরাং নারীর সচেতনতা সৃষ্টি নারী নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য বেশি জরুরি।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, নারী নির্যাতন হলো নারীকে তার প্রাপ্ত যেকোনো অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা যা কিছুতেই কাম্য নয়। কেননা দেশ ও রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্যই নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার দেওয়া প্রয়োজন। আর তাই নারী নির্যাতন রোসে উল্লিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন একান্ত জরুরি।

Comments
Post a Comment