সংস্কৃতি সম্পর্কে সরোকিনের ধারণা আলোচনা কর

সংস্কৃতি সম্পর্কে সরোকিনের ধারণা আলোচনা

ভূমিকা: সংস্কৃতি মানব সভ্যতার এক অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ দিক। সংস্কৃতির মাধ্যমেই মূলত কোনো জাতির আত্মপরিচয় ফুটে ওঠে। সমাজ ও সভ্যতাভেদে সংস্কৃতির ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। সংস্কৃতির এই নিগূঢ় ধারণা এবং এর গতিশীলতা ব্যাখ্যা করতে যে কজন সমাজবিজ্ঞানী কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে পিতিরিম সরোকিন (Pitirim Sorokin) অগ্রগণ্য। ১৮৮৯ সালের ২১ জানুয়ারি রাশিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মগ্রহণকারী এই মনীষী গ্রেনোভা টিচার্স সেমিনারিতে অধ্যয়নকালে প্রথমবারের মতো বৃহত্তর সমাজ ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসেন। তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও গবেষণার নির্যাস হিসেবে রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ 'Social and Cultural Dynamics'-এ তিনি সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক এবং এর বিবর্তন নিয়ে বৈপ্লবিক আলোচনা করেছেন।

সংস্কৃতি সম্পর্কে সরোকিনের ধারণা

সংস্কৃতি সম্পর্কিত সরোকিন-এর ধারণার ব্যাখ্যা:

সরোকিন তাঁর 'Society Culature and Personality গ্রন্থে বিভিন্ন উপাদানের প্রেক্ষিতে সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি তাঁর সংস্কৃতি সম্পর্কিত ধারণায় সংস্কৃতির তিনটি মূল উপাদানের কথা উল্লেখ করেছেন। নিম্নে উপাদান তিনটি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১. বিশ্বাসবাদী সংস্কৃতি:

সরোকিনের মতে, কোনো সর্বব্যবস্থাকে আধ্যাত্মবাদী বলা হবে যখন মানুষ বিশ্বাস করবে যে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় বা বস্তুর বাইরেও গভীরতার কোনো বাস্তবতার অস্তিত্ব বর্তমান। এ অধ্যাত্মিবাদী বা বিশ্বাসবাদী সংস্কৃতির সদস্যারা সাধারণত বিশ্বাস থেকে উৎসারিত সত্যকে মেনে চলে। এ ধারণার উপর প্রবল বিশ্বাস যে, "ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পারিপার্শ্বিকতার পিছনে একটি অন্তর্নিহিত সত্য রয়েছে। অতীন্দ্রিয় এবং অতি প্রাকৃতিক ঈশ্বরের মাঝেই প্রকৃত মূল্যাবোধের এবং প্রকৃত সত্য নিহিত।"

সরোকিন তার 'Social and Cultural Dynamies প্রশ্ন গ্রন্থে বিশ্বাসভিত্তিক সংস্কৃতির নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করেছেন- (ক) সত্যকে মনে করা হয় অতীন্দ্রিয় নির্বস্তুক এবং চিরায়ত সত্তা।

(খ) চাহিদা ও উদ্দেশ্য হচ্ছে মূলত আধ্যাত্মিক।

(গ) এদের সন্তুষ্টি অর্জন করা সর্বোচ্চ শিখরে পৌছে।

(ঘ) এ চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা মিলাতে হলে দৈনিক অধিকাংশ চাহিদাকে যথাসাধ্য মাত্রায় মিটিয়ে দিতে হবে।

২. আদর্শবাদী সংস্কৃতি:

আদর্শবাদী সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রকৃত সত্যের এবং প্রকৃত মূল্যবোধের গুরুত্ব অপরিসীম। তা কিছুটা অতীন্দ্রিয় আবার কিছুটা যুক্তিভিত্তিক আবার কোনো ক্ষেত্রে কল ইন্দ্রিয়মুখী। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, এ সংস্কৃতির উপাদানগুলো মূলত বিশ্বাসমুখী এবং ইন্দ্রিয়মুখী উপাদানের সংশ্লেষণ। সরোকিন। আদর্শবাদ সংস্কৃতি সম্পর্কে বলেছেন, পরিমাণগতভাবে এ মন সংস্কৃতি কমবেশি বিশ্বাসবাদী এবং ইন্দ্রিয়বাদীর সংস্কৃতির নি একাত্মাতার প্রতিনিধিত্ব করে। এ পরিবর্তনমুখী তবে বস্তু অবশ্যই আত্মার সম্পর্কের মাত্রা। এ দুয়ের মধ্যে সামন্ত্যস্য প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আত্মার উন্নতির পাশাপাশি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাহ্যিক বস্তুসমূহের রূপান্তর ঘটাতে হবে। অন্য অর্থে এটা উভয় সংস্কৃতির অধিকার আদায়ে সচেষ্ট।

৩. ইন্দ্রিয়বাদী সংস্কৃতি:

মানুষ যখন শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সমূহকে সত্য বলে ধরে নেয় তখন সরোকিন এটাকে ইন্দ্রিয়লব্ধ একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ইন্দ্রিয়বাদী সংস্কৃতিতে প্রকৃত সত্য এবং মূল্যবোধ সবই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং সংস্কৃতির সদস্যরা সকলই তাদের বিশ্বাসকে ইন্দ্রিয়ের কাছে সমর্পণ করে দিয়েছে। তারা অতীন্দ্রিয় কোনো সত্যকে খুঁজে বেড়ান না, তাকে বিশ্বাসও করেন না। এ সংস্কৃতির চাহিদা ও লক্ষ্য হচ্ছে জৈবিক এবং তারা সকল চাহিদার চূড়ান্ত সমষ্টিতে বিশ্বাসী এবং সন্তুষ্টি বাস্তবায়িত করার মাধ্যমে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের আধ্যাত্মিক উন্নতি নয়, বরং তার দৃশ্যমান। জগতের উন্নতি করে থাকে। সংক্ষেপে বলা যায় যে, ইন্দ্রিয়বাদী সংস্কৃতির সকল বৈশিষ্ট্য বিশ্বাসবাদী সংস্কৃতির বিপরীত।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সরোকিনের সংস্কৃতি সংক্রান্ত ধারণা আধুনিক সমাজতত্ত্বের এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। সংস্কৃতি সম্বন্ধে সরোকিন প্রথম দিককার আলোচনা সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানের অসংখ্য পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে তুলে ধরেছেন। তাছাড়া তিনি তাঁর তাত্ত্বিক লেখনীর মধ্যে সামাজিক সাংস্কৃতিক সিস্টেমের উচ্চানুক্রমে এবং তাদের অখণ্ডতার মাত্রাও উন্মুক্ত করেছেন। সর্বোপরি সরোকিনের সংস্কৃতির সংক্রান্ত তাত্ত্বিক অবদান সমাজতন্ত্রের গুরুত্বকে অনেক মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়ছে।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন