-->

নারীবাদ কী? বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের কারণ আলোচনা কর

নারীবাদ কী? বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের কারণ আলোচনা কর

ভূমিকা: সাম্যবাদ, সমাজবাদ, পুঁজিবাদ, বর্ণবাদ, ফ্যাসিবাদ, নাজিবাদ, জাতীয়তাবাদ, অধি-জাতীয়তাবাদ ইত্যাদির অনুকরণে ফেমিনিজমের অনুবাদ করা হয় নারীবাদ। প্রকৃতপক্ষে, একজন মানুষ হিসেবে নারীর পূর্ণ অধিকারের দাবি হলো নারীবাদ। নারী অধিকার তথা নারীমুক্তি আন্দোলনে যারা অবদান রেখেছেন তাদের নারীবাদী আখ্যায়িত করা হয় এবং নারীর প্রতি বৈষম্য শোষণের বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতনতাবাদ বলা হয় নারীবাদ।

নারীবাদ কী? বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের কারণ

নারীবাদ সংজ্ঞা:

নারীবাদ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Fominion ইংরেজি Fentiniani শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ Famine থেকে যার অর্থ নারী। এই Famine শব্দটির সাথে বা বাদ কথাটি সংযুক্ত হয়ে নারীবাদ রূপ লাভ করেছে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা:

বিভিন্ন নারীবাদী বিভিন্নভাবে নারীবাদের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

সারা মিলস তাঁর Feminist Stylinic (1995) গ্রন্থে বারীবাদকে নিম্নোক্তভাবে উপস্থাপন করেছেন, 'অধিকাংশ নারীবাদই একটি বিশ্বাস ধারণ করে যে, নারীর একটি গ্রপে হিসেবে পুরুষের কাছ থকে নিপীড়নমূল ও ভিন্নতর আচরণ নায় এবং তাহা ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকায়।

Rosalind Deimar বলেন, "নারীখান মূলত সমাজে নারীর অবস্থান পরিবর্তনের জন্য সক্রিয় আগ্রহ।"

প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ও বাংলাদেশের অন্যতম নারী চিন্তাবিদ সালমা খান বলেন, "নারীবাদ হলো নারী-পুরুষের সমন্বয়ে একটি ন্যায়বিচার ভিত্তিক সুষম ও উন্নত সমাজ সৃষ্টির প্রক্রিয়া মাত্র।"

সমাজতন্ত্রী নারী চিন্তাবিদ ক্লারা জেটকিন বলেন, নারীবাদ বলতে নারীর প্রতি রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক অস্বীকারকে বোঝায়। 

ক্রিস্টিনা হফ সমার্স বলেন, নারীবান হচ্ছে নারীর জন্য উদ্বেগ এবং নারীর প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ প্রত্যক্ষ করতে দৃঢ় সংকল্প।

এস্টেল ফ্রিডম্যান নারীবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, "নারীবাদ একটি বিশ্বাস যে, নারী ও পুরুষের অন্তনির্হিত মূল্য সমান। যেহেতু অধিকাংশ সমাজব্যবস্থা পুরুষকে গোষ্ঠী হিসেবে অধিকতর সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে। কাজেই নারী ও পুরুষের হধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার জন। সামাজিক আন্দোলন অত্যাবশ্যক।"

সাসকিয় উইরিখা বলেন, "নারীবাদ হচ্ছে একটি বিধাংসী প্রক্রিয়া যা নারী সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণা পাল্টে দিয়ে এর নতুন অর্থ খুঁজে বেয় কার, জেন্ডার সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে বর্জন করে বাক্তিগত এবা সামগ্রিকভাবে নায়ীত্ব সম্পর্কে নতুন ধারণ প্রদান করে।"

নারীবাদ হলো একটি বহুমুখী ধারণা, যার মাধ্যমে নারীয় পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমতাভিত্তিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সচেতনতার সৃষ্টি হয়।

নারী নির্যাতনের কারণসমূহ 

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারী নির্যাতনের পেছনে বহুবিধ কারণসমূহ বিদ্যমান নিম্নে সেসকল বিষয় আলোচনা করা হলো-

১. পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা:

পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীকে মনে করা হয় বলহীন ও অবলা। তাই পুরুষশাসিত সমাজে নারীর যথাযথ মূল্যায়ন হয় না বলেই তাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পুরুষরা তাদের ওপর নানাবিধ নির্যাতন চালায়।

২. নারীশিক্ষার অনগ্রসরতা:

নারী নির্যাতনের একটি অন্যতম কারণ অশিক্ষা, বাংলাদেশে শিক্ষায় ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে নারীরা পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে আছে। ফলে তারা নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন নয়। তাই তারা অহরহ পুরুষের  নির্যাতনে শিকার হয়।

৩. দরিদ্র্যতা:

দরিদ্র্যতা নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ। দারিদ্র্যতার কারণে বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তাই তারা নানারকম অজ্ঞতা ও কুসংস্কার বিশ্বাস করে। এসব অজ্ঞতা ও কুসংস্কার নির্যাতনকে উৎসাহিত করে।

৪. পরকীয়া:

নগরায়ন ও শিল্পায়ন দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পেশার ক্ষেত্রে গতিশীলতা তৈরি হয়েছে, ফলে নারী-পুরুষের একত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে নারী পুরুষের পরকীয়ার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। তাই স্বামীর পরকীয়ার পরিণতির কারণে এবং স্ত্রীর পরকীয়ার কারণেও স্বামী কর্তৃক নারী  নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।

৫. বহুবিবাহ:

বহুবিবাহ নারী  নির্যাতনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বারণ। গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় বহুবিবাহের প্রচলন দেখা যায়। নিম্ন আয়ের লোকেরা বিভিন্ন কারনে বহুবিবাহ করে কিন্তু স্ত্রীদের প্রাপ্য মর্যাদা তো দেয়ই না, বরং তাদের ওপর নির্যাতন চালায়।

৬. যৌতুকপ্রথা:

নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে যৌতুকপ্রথা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বর অনেক ক্ষেত্রে তার জীবনের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য বিয়েকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যাবহার করতে গিয়ে যৌতুক দাবি করে। কন্যাপক্ষ থেকে যৌতুকের দাবি পূরণ করতে ব্যর্থ হলে বরের পক্ষ থেকে স্ত্রীর ওপর অমানসিক নির্যাতন নেমে আসে।

৭. প্রেমে ব্যর্থতা:

প্রেমে ব্যর্থতা বা প্রেম নিবেদনে সাড়া না পেয়ে হতাশাজনিত কারণে বা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে থাকে।

৮. পুত্রসন্তানের কামনা:

সামাজিক অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের কারণে স্বামী বা তার পরিবারের সদস্যরা মনে করে কন্যাসন্তান জন্ম দেয়া স্ত্রীর নিজস্ব ব্যপার। তাই পুত্রসন্তানের লোভে অনেক স্বামী স্ত্রীর ওপর নির্যাতন চালায়।

৯. অনিচ্ছাকৃত বিবাহ:

বাঙালি সমাজব্যবস্থার বিয়ের ক্ষেত্রে অনেক পরিবারই কন্যার মতামতকে গুরুত্ব দেন না। ফলে মেয়েদের অনিচ্ছাকৃত বিবাহের কারণেও বিবাহিত জীবন নীড়ন ও নির্যাতনে ভরে ওঠে।

১০. ধর্মীয় কুসংস্কার:

বাংলাদেশের নারীরা ধর্মীয় কারণে নির্যাতনকে আনেক সময় কপালের লিখন বলে মেনে নেন। কারণ ধর্মে বলা হয়ছে, "স্বামীর পদতলে স্ত্রীর আন্নাত'। তাই তারা স্বামীর অন্যায় নির্যাতনে প্রতিবাদ করে না।

১১. নির্ভরশীলতা:

বাঙালি সমাজে নারীরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল। তাই তাদের পুরুষের মর্জির ওপর নির্ভর করে চলতে হয়। ফলে পুরুষ দ্বারা তারা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post