ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীদের জীবনে ভূমির প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর

ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীদের জীবনে ভূমির প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর

ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনে ভূমি কেন গুরুত্বপূর্ণ তা আলোচনা কর

ভূমিকা: প্রায় প্রতিটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বা উপজাতীয় সমাজে ভূমিবিষয়ক এ ধরনের আধ্যাত্মিক চর্চার পরিসর থাকে, যা কালের বিবর্তনে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। কীভাবে কোথা থেকে এই আধ্যাত্মিকতার সূত্রপাত তা খুঁজতে গেলে ভূমির সাথে সম্প্রদায়ের এক ধরনেরর মানবিক সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় যার মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির কোনো সম্পর্ক নেই। এই মানবিক সম্পর্কের কারণে ভূমি হয়ে ওঠে তাদের অস্তিত্বের অংশ।

ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীদের জীবনে ভূমির প্রয়োজনীয়তা

ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনে ভূমির প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব:

১. প্রথম জাতিতত্ত্ব:

Bob Joseph (২০১৫) সালে ভূমির সাথে আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সম্পর্ক বোঝাতে তার প্রথম জাতিতত্ত্ব' প্রদান করেন। এ তত্ত্বে মনে করা হয়, কোনো ভূখন্তে সর্বপ্রথম যে জাতি আগমন করে সেই জাতির সাথে ঐ ভূখন্ডের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি দেখান, কোনো ভূখণ্ডে প্রথম যে জাতি বসতি স্থাপন করে সেই জাতির সাথে ঐ ভূখণ্ডের যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা অন্য বিভিন্ন সময়ে আগত এবং বসতি স্থাপনকারী বা বসবাসকারী গোষ্ঠীর সম্পর্ক হতে সম্পূর্ণ পৃথক বৈশিষ্ট্য এবং স্বকীয় মাত্রায় স্বতন্ত্র। এরা ভূমিব উপর নির্ভরশীল থাকে এবং ভূমির বিভিন্ন দানে এক ধরনের সুতীব্র কৃতজ্ঞতাবোধ তাদের মধ্যে কাজ করে। এই কৃতজ্ঞতা হতে তারা ভূমিকে রক্ষা করায় জন্য রক্ষকের ভূমিকায় অবলির্ণ হয়।

২. প্রান্তিক গোষ্ঠীর সাথে ভূমির সম্পর্ক:

যেসব ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আধিবাসী নয়, অর্থাৎ ভূমিতে প্রথম বসতি স্থাপন করেননি কিন্তু তারা মূলধারার জনগোষ্ঠীর তুলনায় ক্ষমতা এবং সংখ্যায় প্রান্তিক, তারাও তাদের বসবাসের ভূখণ্ডের সাথে এক বিশেষ ধরনের বন্ধনে আবদ্ধ থাকেন। এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে সমাজের মূল অংশে সংখ্যালঘু শ্রেণির জন্য বহু প্রজন্য ধরে চর্চিত অসমতা একটি প্রতিষ্ঠিত রূপ লাভ করে এবং সমাজের মূল অংশে বসবাস করতে এরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। তখন এরা ভূখণ্ডের অবহেলিত সীমান্যবর্তী অংশের দিকে ক্রমশ সরে যেতে থাকে। সংখ্যাগুরু সমাজের দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে তারা সব ধরনের অসমতা থেকে দূরে সরে যেতে চায় এবং সেখানে গিয়ে তারা নিজ বসতি স্থাপন করে।

৩. ভূমিতে পূর্বপুরুষ অবস্থান করে এমন বিশ্বাসের উপস্থিতি:

যেহেতু বসতি স্থাপনকারী প্রথম প্রজম্মের ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি প্রতিকূলতা সহ্য করে টিকেছিলেন বলে পরবর্তী প্রজন্মগুলো আসতে পেরেছে সেহেতু এই প্রথম প্রজম্মের পূর্বপুরুষরাও আলাদাভাবে সম্মানিত থাকেন। অনেক প্রান্তিক গোষ্ঠীসমূহ তাদের পূর্বপুরুদকে স্রস্টাজ্ঞানে পুজা করে। এই পূর্বপুরুষরা সমাহিত হয়েছেন এই ভূমিতে অথবা তারা দেহ রেখেছেন এই ভূমিতে সুতরাং এই ভূমি তাদের পূর্বপুরুষের ভূমি। এই ভূমিতে তিনি সবসময় থাকবেন। গোষ্ঠীকে রক্ষা করেন তিনি এমন বিশ্বাস অনেক নৃগোষ্ঠীতে দেখা যায়।

৪. ভূমিনির্ভর কুটিরশিল্প অর্থনীতির বিকাশ:

প্রান্তিক, মূলধারা বিচ্ছিন্ন এবং ক্ষমতাহীন হবার কারণে অনেক সময়ে মূলধারায় অর্থনৈতিক বিকাশ প্রকল্পগুলো হতে এসব জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন থাকে। ফলে যথাযথ অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিক সুবিধা বা একটি বৃহৎ শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এর সঠিক সংকুলান এখানে ঘটে না, এসব প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মধ্যে খুব উন্নতমানের হস্তশিল্প এবং কুটিরশিল্পের বিকাশ ঘটে যা মানে ভাগ অনন্য বেশিরভাগ সময়ে এসব কুটির শিল্পের মূল কাঁচামাল ভূমি হতে উৎসারিত কৃষিজ পণ্য বা  সম্পর্কিত বনভূমির বিভিন্ন বনজ উপাদান। ফলে এসব কুটির শিল্পীরা তাদের জীবন জীবিকার জন্য সম্পূর্ণ রূপে ভূমি এবং ভূমিসংশ্লিষ্ট ভাঙ্গলের বিভিন্ন বৃক্ষ উপাদানের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

৫. অস্তিত্বের অংশ হিসেবে ভূমি:

অস্তিত্বের অংশ হিসেবে এসব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনের সাথে ভূমি জড়িয়ে যা, যা থেকে বিচ্ছিন্নতা তাদের জন্য খুব কষ্টদায়ক হয়। Kappa (2015) দেখান, অনেক উপজাতিদের অস্তিত্বের অংশ হিসেবে এই ভূখণ্ড এমনভাবে যুক্ত থাকে যে, এদের নিজস্ব কোনো নাম থাকে না। একটা সময় পরে এরা নিজেদের ভূমির নামেই পরিচিত করতো এবং এভাবে পরিচিত হতেই বেশি স্বপ্তি লাভ করে। তিনি দেখেন আমেরিকার Masailand এর জলাভূমির আশপাশের অধিবাসীরা নিজেদেরকে Masai বলে অভিগ্রত করত। পরবর্তীতে এই বিশাল জলাভূমি বিভিন্ন শিল্প উন্নায়নের ফলে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও এই জনগোষ্ঠী নিজেদের Masai অভিহিত হতে পছন্দ করত। বাংলাদেশের গারো পাহাড়ে বসবাসকারী গারো উপজাতি নিজেদের মান্দি বলে অভিহিত করতে পছন্দ করে। এভাবে দেখা যায়, ভূভাগের সাথে সম্পৃক্ততা এসব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী তাদের অস্তিত্বের অংশ করে নিয়ে বাঁচে।

৬. উপনিবেশ বিচ্ছিন্নতার পর ভূমিকে আশ্রয় করা:

অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীন জনগোষ্ঠী উপনিবেশিত হয়ে যাওয়ার পর উপনিবেশিক শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়। উপনিবেশিক শক্তি ক্ষমতার দাপটে সমাজে সংখ্যাগুরু না হয়েও মূল ক্ষমতা চর্চার প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে ফেলে। এভাবে সমাজের মূলধারার জনগোষ্ঠীকে তারা খুব সহজে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করে ফেলে। সমাজের প্রকৃত যানুষরা উপনিবেশিক শক্তির বিরিন্ন অনৈতিকতার প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠে না এবং তার মূল ভূখণ্ড হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই জনগোষ্ঠী তাদের জীবনের সর্বহারা একটি অবস্থায় উপনীত হয়। সব হারালেও ভূমিটুকু আছে এই বোধ হতে ভূমির জন্য তাদের আকর্ষণ আরও তীব্র হয় এবং এর মাটিকেই তারা নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরতে চায়। নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে এক সময় এই মাটির অধিকার রক্ষায় গোষ্ঠী স্বাধীনতার যুদ্ধেও লিপ্ত হয় উপনিবেশিত বা ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর সাথে।

৭. উদ্যানকৃষি নির্ভরতার জন্য:

বিবর্তনের যে পর্যায়ে উদ্যানকৃষি সমাজের উদ্ভব ঘটে তখন থেকেই ভূমি মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বের জায়গায় চলে আসে। পরবর্তীতে নিবিড় কৃষিতে মানুষের সমাজে ভূমি রীতিমতো সম্পত্তির জায়গায় চলে আলে। উদ্যান কৃষি মূলত স্থানান্তর ভিত্তিক কৃষিকাজ। একটি ভূখন্ডের মাটির উর্বরতা সম্পৃক্ত জলসেচ ইত্যাদির মাধ্যমে সেই অংশে কৃষিকাজ করে ফসল আহরণের পর অন্যত্র স্থান পরিবর্তন করে নতুন ভূমি অন্বেষণ এবং তাতে পুনরায় কৃষিকাজ করা হলো উদ্যান কৃষিকাজের বৈশিষ্ট্য। উদ্যান কৃষিকাজে মানুষের অস্তিত্বই ভূমি, দ্বারা নির্ধারিত হয়। তাই তাদের সংস্কৃতিতে ভূমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৮. বৃহৎ শিল্পায়ন অনুকূল পরিবেশ না থাকা:

মানবসৃষ্ট উন্নয়নের যে বিভিন্ন প্রকল্প তা থেকে এরা বঞ্চিত থাকে প্রতিনিয়ত এই বিষয়টি তাদের আরও বেশি করে তাদের নিজস্ব তুমি নির্ভর কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে উৎসাহিত করে এবং তুমিনির্ভরতা বাড়তে থাকে প্রাকৃতিকভাবে দুর্গম হওয়ায় অনেক সময়ে সঠিক যাতায়াত সুবিধার বিকাশ ঘটানো এখানে কঠিন হলেও শিল্পায়ন ঘটানোর মতো অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ এর অভাব ঘটে। ফলে শিল্পায়ন এখানে ঘটে না। আবার প্রয়োজনীয় সমতল ভূমি না থাকায় এখানে অনেক সময় কৃষিনির্ভর বৃহৎ শিল্পের বিকাশ ঘটানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে উদ্যান কৃষিজাত কাঁচামাল নির্ভর বিভিন্ন কুটিরশিল্প এবং কৃষি ছাড়া অন্য ধরনের অর্থনৈতিক বিকাশ কষ্টসাধ্য বিধায় এখানে মানুষকে ভূমিনির্ভর হয়েই বাঁচতে হয়।

৯. প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে অসহায়:

অনেক সময়ে মূল ধারার জনগোষ্ঠীর সাথে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা, যাতায়াত সমস্যা প্রাকৃতিক দুর্গমতা, সংখ্যালঘুড়ের যতনা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে অতি সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এদের জীবনে বিপন্নতা তৈরি হতে পারে। দুর্যোগে বিপন্ন হলেও অনেক সময়ে সঠিক স্থানে সঠিক সময়ে খবর পাঠানোর মতো প্রাযুক্তিক জ্ঞানও এদের থাকে না। ফলে বিপন্নতার পরিমাণ বাড়তেই থাকে। এই বিপন্নতা কমানোর মতো যথেষ্ট প্রাযুক্তিক ক্ষমতা এদের না থাকায় প্রকৃতির কাছে নতজানু হয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় এদের থাকে না। প্রকৃতির একটি বিরাট অংশ ভূমি। ভূমি রুষ্ট হলে তার উৎপাদন কমার। খাদ্যের অভাবে আবারও বিপর্যয় উদ্বৃত হবে। এসব দূর্যোগের সম্ভাবনা হতে নিজেকে রক্ষা করার একটি মান্ন উপায় হলো উৎপাদন বৃদ্ধি, যা শুধু ভূমিতেই হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়লে তাই মূল আশ্রয়ও ভূমি, অন্য কেউ এগিয়ে আসার না। এবোধ থেকে ভূমির সাথে তাদের সম্পর্ক বাড়তে থাকে।

১০. সমাজ সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ভূমির সাথে নৈকট্য বাড়ে:

ভূমি নির্ভরতা এবং ভূমি সম্পৃক্ততা এসব জনগোষ্ঠীর জীবনে এমনভাবে অন্তর্বির থাকে যে, এদের সমাজ সাংস্কৃতিক বিভিন্ন আচার আচরণ এবং চর্চার মধ্য দিয়ে ভূমিকে বিভিন্নভাবে বিসারিত করা হয়। অনেক সময়ে মূল ধারার ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও এদের বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-আচরণেও ভূমিবিষয়ক প্রত্যয়ন অধিকতর প্রতিভাত হয়। উৎপাদন ফসলকেন্দ্রিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান পর্যন্ত এমনকি অনেক সময়ে রুচিভিত্তিক বিভিন্ন দেব-দেবীর উপস্থিতিও এসব প্রান্তিক মানুষের ধর্মে লক্ষণীয় হয়। বিভিন্ন স্বকীয় স্বতন্ত্র প্রকৃতিনির্ভর পার্বণ, পূজা, দেব-দেবী উপস্থিতি ধর্মের অনুষ্ঠানে থাকে আবার পাশাপাশি সামাজিক বিভিন্ন আচার আচরণেও বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান-নির্ভরতা এবং প্রকৃতি সংশ্লিষ্টতা হিসেবে সমাজের ভূমি ঘনিষ্ঠতার পরিচায়ক।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী তাদের আদি ভূমি থেকে বিভিন্ন কারণে তারা উৎপাটিত এই আত্মিক যোগাযোগ এর নিবিড়তা বাহিত হতে থাকে। আদিবাসী বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে ভূমির যে ঐকান্তিক আবেগীয় বন্ধন তৈরি হয়, দেখা যায় মূলধারায় জনগোষ্ঠীর সাথে সেই বন্ধন অনেক সময় তৈরিই হয় না।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post