-->

ক্ষমতায়ন কী? নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আলোচনা কর

ক্ষমতায়ন কী? নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

ভূমিকা: সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতায়ন বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ্রোচ। ক্ষমতায়ন শব্দটি বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে - উন্নয়নশীল দেশে। উন্নয়নশীল দেশে নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর এ কারণে ক্ষমতায়ন খুব বেশি প্রয়োজন।

ক্ষমতায়ন কী? নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

ক্ষমতায়নের সংজ্ঞা:

ক্ষমতায়ন হলো বস্তুগত, মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ওপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, এই সম্পদকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন-

১। বস্তুগত সম্পদ (ভূমি, পানি, বন);

২। মানবিক সম্পদ (মানুষ তার দেহ, শ্রম, দক্ষতা);

৩। বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ (জ্ঞান, তথ্য, তথ্যে অভিজ্ঞতা, ধারণা);

৪। আর্থিক সম্পদ (অর্থ, অর্থে অভিজ্ঞতা)।

এছাড়াও মানুষের সামাজিক সম্পদ রয়েছে; যেমন- সামাজিক সম্পর্ক, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, পারস্পরিক আস্থা।

ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নারী প্রগতিসংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেছেন, "ক্ষমতায়ন হচ্ছে মানুষের অধিকার অর্জিত হওয়া, যার দ্বারা নিজের জীবনের পাশাপাশি সমাজ পরিপার্শ্বের ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়ন সম্ভব হয়। শুধু ক্ষমতা থাকা নয় দরকার ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার; শুধু উঁচু পদে আসীন হওয়া নয়, দরকার পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ পদাধিকারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ; শুধু সম্পদ থাকা নয়, দরকার সম্পদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। ক্ষমতার ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার অর্জিত হওয়া অর্থাৎ ক্ষমতায়ন হচ্ছে এমন একটি বিষয় যার দ্বারা মানুষ তার নিজের শরীর, মন ও কাজের ওপর পূর্ণনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

ক্যারলিন মোসার (Caroline Moser) ক্ষমতায়নকে সংজ্ঞায়িত করেছেন, ক্ষমতায়ন হলো কোনো অধিকার পেলে তার প্রয়োগের অধিকারও, ভোগ করা। অর্থাৎ যদি কেউ সম্পত্তি পায় তাহলে সে সম্পদের উপর পূর্ণনিয়ন্ত্রণ করার অধিকার হলো ক্ষমতায়ন।

নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

নিম্নে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো উল্লেখ করা হলো-

১. নারীর অধস্তনতাকে দূর করা:

নারীর অধস্তনতাকে দূর করা নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এজন্য নারীকে শিক্ষিত করে তোলার ব্যবস্থা করা হয়। শিক্ষা নারীকে সচেতন করে তোলে। তখন সে পিতৃতন্ত্রের জোয়াল তার কাঁধ হতে অপসৃত হয় এবং দূর হয় নারীর অধস্তনতা।

২. রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন করা:

নারীর স্বাধীনতায় রাজনৈতিক কাঠামো হস্তক্ষেপ করে। সনাতন রাজনৈতিক কাঠামোয় নারীর অংশগ্রহণ নেই। এতে নারী তার ভূমিকা পালন করতে পারে না। তার কোনো রাজনৈতিক অধিকার নেই। তাই নারীর ক্ষমতায়নের জন্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা দরকার।

৩. সামাজিক কাঠামো পরিবর্তন করা:

নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে একটি বাঁধা হলো প্রচলিত সামাজিক কাঠামো। সামাজিক কাঠামো নারীর চলাচলের উপর নানা বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি করে। এর বিঘ্ন দূর করতে পারলে নারীর চলাচলের গতিপথ সহজ হবে। ফলে নারীর ক্ষমতায়নের পথ সুগম হবে।

৪. প্রচার মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা:

আধুনিক প্রচার মাধ্যম নারীকে নগ্নভাবে উপস্থাপন করে। তাকে যৌনসামগ্রি হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়। ফলে তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা হয়। এটা তার ক্ষমতায়নের পক্ষে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য ক্ষমতায়নের লক্ষ্য হলো প্রচার মাধ্যমে নারীকে নগ্নভাবে উপস্থাপনের বিরোধিতা করা।

৫. নারী-পুরুষের সমতা অর্জন:

নারী-পুরুষের সমতা অর্জন করা নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। বর্তমান সমাজব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা উচ্ছেদ না করতে পারলে নারী-পুরুষের সমতা অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য ক্ষমতায়নের লক্ষ্য হলো পুরুষতন্ত্র উচ্ছেদ করে নারীর ক্ষমতায়ন লাভ করা।

৬. নারী উন্নয়ন মডেল ও কৌশল গ্রহণ করা:

উন্নয়নের মডেল ও কৌশল উদ্ভাবন করা নারীর ক্ষমতায়নের আরেকা। লক্ষ। এতে থাকবে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ। ফলে এটা তাদের সচেতনতা বাড়াবে। নারীরা সচেতন হলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়বে। আর এটা সম্ভবপর হলে তাদের ক্ষমতায়নও ঘটবে।

৭. বস্তুগত সমাজের উপর নারীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা:

বর্তমান সমাজব্যবস্থায় বস্তুগত সম্পদের উপর নারীর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ সামান্য। ফলে ক্ষমতায়ন হতে তাদের অবস্থা অনেক দূরে। ক্ষমতায়নের জন্য চাই বস্তুগত সম্পদ অর্জন ও তার সমাবেশকরণ। তাই ক্ষমতায়নের অন্যতম লক্ষা হলো বস্তুগত ও পার্থিব সম্পদের উপর তার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

৮. নারীদের স্বার্থে পুরাতন আইন সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়ন:

সব দেশে পুরাতন আইন পুরুষদের দ্বারা রচিত । এতে পুরুষদের স্বার্থ রক্ষিত। এসব আইন নারীর অধস্তনতা সৃষ্টি করে রেখেচে। তাই নারীর স্বার্থে নতুন আইন প্রণয়ন করা  প্রয়োজন যাতে নারীর ক্ষমতায়ন ঘটে।

৯. ধর্মীয় মৌলবাদ পরিহার করা:

ধর্মীয় মৌলবাদ নারীর অর্ধস্তনতার  একটি কারন। যার কারনে নারী নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হয়। যার ফলে রাজনীতি চর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যোগদানসহ বিভিন্ন স্থানে বাধাপ্রাপ্ত হয়।যা নারীর মৌলিক বিকাশের পথে বাধা সৃস্টি করে তাই নারী ক্ষমতায়নে এসকল বাধা দূর করা নারী ক্ষমতায়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

যখন নারী নিজেকে নারী নয় একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে এবং সকল অধিকার বোগ করতে পারবে তখনই নারীর ক্ষমতায়ন ঘটবে।

নবীনতর পূর্বতন