রেনেসাঁ (Renaissance) সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা
ভূমিকা:- রেনেসাঁ (Renaissance) সভ্যতার ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ। মধ্যযুগীয় সভ্যতাকে আধুনিক যুগে নিয়ে আসার পিছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে রেনেসাঁ। অধিকাংশ তাত্ত্বিকগণের মতে, রেনেসাঁ (Renaissance) বলতে মধ্যযুগের শেষে আধুনিক যুগের মধ্যবর্তী সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার সমন্বয় কে বোঝায়। রেনেসাঁ সূচনা হয় ফ্লোরেন্স প্রজাতন্ত্রে, যা ইতালির অনেক রাজ্যের মধ্য একটি।
রেনেসাঁ (Renaissance):
রেনেসাঁ শব্দের অর্থ পুনর্জাগরন বা নবজাগরন। বহুকালের অবহেলিত প্রাচীন গ্রিস এবং রোমের কৃষ্টি ও সাহিত্য নবজম্ম দান করার জন্য সমগ্র ইউরোপে ত্রয়োদশ শতাব্দিতে এক বিরাট সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে উঠে। এ সাংস্কৃতিক আন্দোলন ইউরোপের ইতিহাসে রেনেসাঁ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এতএব বলা যায় যে রেনেসাঁ মধ্যযুগীয় অন্ধকার থেকে ইউরোপীয় সমাজকে আলোর দিকে নিয়ে আসে।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা
ঐতিহাসিক ডেভিস (Davies) বলেন- “মধ্যযুগে মানুষের শৃঙ্খলিত ও অবরুদ্ধ স্বাধীনতা প্রীতি ও সাহসিকতাপূর্ণ চিন্তাধারা যে পুনর্জম্ম তাই, রেনেসাঁ নামে পরিচিত।
আসলে রেনেসাঁ বলতে বোঝায়, সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক তথা অন্য যে কোন ধরনের বন্ধন থেকে মুক্ত। আর চিন্তা, যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির উপর নির্ভর করে, শিল্প, সৌন্দর্য, দর্শন ও বুদ্ধি বৃত্তির চর্চা করা। রাষ্ট্র-সমাজে, শিল্পে-সাহিত্যে, ব্যবসা-বাণিজ্যে এক কথায় জীবনের সকল স্তরে বিপ্লব আনার নামই রেনেসাঁ। (আহমদ, ২০০৪:৯৬১)
উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায় যে রেনেসাঁ হলো চিন্তা জগৎ এ জাগরণ। Renaissance রেনেসাঁ মানুষের মধ্যে পুরাতন ধ্যানধারনা বদলে দিয়ে নতুন ধ্যানধারনার সৃষ্টি করে। ইতালিতে সংঘটিত রেনেসাঁ ক্রমান্বয়ে ইউরোপ হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
রেনেসাঁর বৈশিষ্ট্যসমূহ
রেনেসাঁ আন্দোলনের ফলে যে বৈপ্লাবক পরিবর্তন সাধিত হয় তা নিম্নরুপ-
১। হিউম্যানিজম
হিউম্যানিজম রেনেসাঁ যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাধারা, যা মানুষের বুদ্ধি, স্বাধীনতা, এবং সৃজনশীলতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং গুরুত্ব দেয়। এটি ধর্মীয় কর্তৃত্বের বাইরে গিয়ে মানব সমাজের উন্নতি, যুক্তি ও বিজ্ঞানকে প্রাধান্য দেয়, এবং প্রাচীন গ্রিক-রোমান সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন ঘটায়। এর মূল উপজীব্য বিষয় ছিলো মানুষের দেবত্ব গুনাবলিকে প্রাধান্য দিয়ে সাহিত্যকর্মে মানবতার জয়গানকে মুখর করে তোলা।
২। ধর্মীয় মুক্তি
রেনেসাঁর পূর্বে মানুষের চিন্তা, সাহিত্য যাজক সম্প্রদায় কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হত। ল্যাটিন ভাষায় লিখিত ‘দ্যা বাইবেল’ ছিলো সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ।
৩। যুক্তিবাদী মানসিকতার উদ্ভব
অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে সকল বিষয়কে যুক্তির সাথে যাচাই করে নেবার মানসিকতা তৈরি হলো রেনেসাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
৪। ব্যক্তিত্বের বিকাশ
ধর্মীয় পরিমশুলে পোপ তার প্রশাসনিক পরিমন্ডলে রাজা বাদশাহ ব্যতীত তৎকালীন সমাজে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিত্বের কোন মূল্যয়ন ছিলো না। রেনেসাঁ মানুষকে স্বীয় ব্যক্তিত্ব খুজে নিয়ে নিজের প্রাপ্ত আইনত অধিকারগুলো বাস্তবায়িত করার জন্য প্রেরণা যুগিয়েছিল।
৫। বিজ্ঞানের অগ্রগতি
ষোড়শ শতাব্দিতে প্রাকৃতিক ও গবেষনামূলক বিজ্ঞান চরম উৎকর্ষ লাভ করে। এক্ষেত্রে কোপারনিকাস, টলেমি ও গ্যালিলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে মানুষের মনে এ বৈজ্ঞানিক মননশীলতার পশ্চাতে ছিলো হিউম্যানিস্টি পন্ডিতদের দ্বারা উদীপ্ত নতুন যুক্তিবাদী ও অনুসন্ধানী যুক্তিবাদী।
৬। চিত্রকলার স্বাধীনতা
প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যর প্রতি অনুরাগ ধর্মীয় প্রভাব বর্জিত কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ বর্ধিত হয়। ফলে কলা, স্থাপত্যবিদ্যা, ভাস্করবিদ্যা, সংগীত, চিত্রবিদ্যা ও অংকনবিদ্যা অনুশীলনের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবরবতন সূচিত হয়।
রেনেসাঁ মধ্যযুগীয় অন্ধকার থেকে ইউরোপীয় সমাজকে আলোর দিকে নিয়ে আসে। রেনেসাঁর (Renaissance) ফলে ধর্মনিরপেক্ষতা, শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনা, ঐতিহাসিক গবেষণায় যে চেতনা জাগ্রত হয় সেই চেতনাটি মানবসভ্যতাকে আজকের পর্যায় এ নিয়ে এসছে।
আরও জানুন- রেনেসাঁর কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত।
