গবেষণা কী? গবেষণা কাকে বলে? গবেষণার উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য

গবেষণার সংজ্ঞা, উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা

ভূমিকা:- গবেষণা হলো সত্য অনুসন্ধানের একটি নিরবচ্ছিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। শব্দগতভাবে 'গবেষণা' বা 'Research' বলতে বোঝায় কোনো বিষয়কে বারবার বা পুনরায় অনুসন্ধান (Re-search) করা। এটি মূলত অপেক্ষাকৃত উন্নত পর্যবেক্ষণ এবং ভিন্নধর্মী বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় নতুন জ্ঞান অন্বেষণ ও বিদ্যমান জ্ঞানের সাথে বাড়তি তথ্য সংযোজন করার একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা। সমস্যা সমাধানের নতুন পন্থা উদ্ভাবন এবং মানুষের সহজাত অনুসন্ধান প্রবণতাই গবেষণার মূল চালিকাশক্তি, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য উন্মোচন এবং মানবজাতির কল্যাণ সাধন করা। আধুনিক সভ্যতার প্রতিটি অগ্রগতির মূলে রয়েছে নিবিড় গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা।

গবেষণা কী? গবেষণার উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য

গবেষণার সংজ্ঞা

গবেষণার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Research. Research শব্দের অর্থ হলো পুনঃঅনুসন্ধান। অন্যভাবে বলা যায়, গবেষণা হলো জ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন কিছুর সংযোজন (something addition to knowledge)। আর নতুন কিছু সংযোজনের জন্য প্রয়োজন অনুসন্ধান করে তাই বলা যায়, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে তথ্যানুসন্ধানের একটি কলা হলো গবেষণা।

আবার বলা যায়, কোনো নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহের জন্য বৈজ্ঞানিক ও সুসংবদ্ধ অনুসন্ধানই গবেষণা।

গবেষণা সম্পর্কে প্রামাণ্য সংজ্ঞা

বিভিন্ন লেখক বিভিন্নভাবে গবেষণাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিম্নে তাদের দেওয়া কয়েকটি সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো-

Marry E. Macdonald (polansky, 1960:24) বলেছেন "সুশৃঙ্খল অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রচলিত জ্ঞানের সাথে বোধগম্য ও যাচাইযোগ্য জ্ঞান সংযোজন প্রক্রিয়ায় হলো গবেষণা।"

উইলিয়াম পি Scott এর মতে "গবেষণা কোন সমস্যার পদ্ধতিগত ও উদ্দেশ্য ভিত্তিক অধ্যয়ন, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে সাধারণ নীতি বা তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা"

রিচহার্ড M. Grinnell, Jr. (1997:4) তার গবেষণায় একটি সামগ্রিক সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে গবেষণা হচ্ছে সাধারণভাবে প্রয়োগযোগ্য নতুন জ্ঞান সৃষ্টি বা কোন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পরিচালিত কাঠামোবদ্ধ অনুসন্ধান যেখানে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।"

Advanced learners Dictionary of current English এ উল্লেখ করা হয়, "গবেষণা হচ্ছে জ্ঞানের যেকোনো শাখায় নতুন নতুন তথ্য খুঁজে পাওয়ার একটি সযত্ন অনুসন্ধান।"

Green এর মতে "জ্ঞান অনুসন্ধানের জন্য মানসম্মত পদ্ধতির প্রয়োগকেই গবেষণা বলে।"

Paul D. Leedy (1989:12) উল্লেখ করেন যে "Research is a critic and exhaustive investigation or experimentation having as its aim the revision of accepted conclusions in the light of vewly discovered facts."

গবেষণার উদ্দেশ্য (Objectives of Research):

১. নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা: গবেষণার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো অজানাকে জানা এবং নতুন কোনো সত্য বা তথ্য আবিষ্কার করা।

২. বিদ্যমান জ্ঞান যাচাই: অতীতে আবিষ্কৃত কোনো তত্ত্ব বা তথ্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে কতটা কার্যকর তা পুনরায় পরীক্ষা করে দেখা।

৩. কোনো সমস্যার কার্যকর সমাধান খোঁজা: সামাজিক, অর্থনৈতিক বা বৈজ্ঞানিক কোনো সংকটের কার্যকর ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা।

৪. ভবিষ্যদ্বাণী করা: সংগৃহীত তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের কোনো বিশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা।

৫. কার্যকারণ সম্পর্ক উদ্ঘাটন: বিভিন্ন সামাজিক বা প্রাকৃতিক ঘটনার মধ্যে কোনো নিগূঢ় সম্পর্ক বা কারণ বিদ্যমান কি না, তা বিশ্লেষণ করা।

গবেষণার মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ

১. সুশৃঙ্খল ও পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া (Systematic): গবেষণা কোনো এলোমেলো কাজ নয়। এটি নির্দিষ্ট কিছু ধাপ বা পর্যায় মেনে চলে। সমস্যা চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে ফলাফল উপস্থাপন পর্যন্ত প্রতিটি কাজ একটি সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা মেনে করতে হয়।

২. বস্তুনিষ্ঠতা (Objectivity): গবেষকের নিজস্ব আবেগ, পছন্দ-অপছন্দ বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কোনো স্থান গবেষণায় নেই। সংগৃহীত তথ্য যা বলবে, গবেষককে নিরপেক্ষভাবে সেই ফলাফলই উপস্থাপন করতে হয়।

৩. তথ্যভিত্তিক ও প্রমাণনির্ভর (Empirical): গবেষণা সবসময় বাস্তব অভিজ্ঞতা বা পরীক্ষালব্ধ প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। নিছক কল্পনা বা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না।

৪. যৌক্তিক বিশ্লেষণ (Logical Analysis): গবেষণার প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে যৌক্তিক ভিত্তি থাকা আবশ্যক। আরোহী (Inductive) বা অবরোহী (Deductive) পদ্ধতির মাধ্যমে তথ্যের বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়।

৫. নিয়ন্ত্রণযোগ্য চলক (Controlled Variables): বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অনেক সময় বাইরের অপ্রাসঙ্গিক চলকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যাতে মূল গবেষণার বিষয়ের ওপর তাদের প্রভাব বোঝা যায়।

৬. নির্ভুলতা ও নির্ভরযোগ্যতা (Accuracy and Reliability): গবেষণায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি নির্ভুল হতে হয়। একটি ভালো গবেষণার বৈশিষ্ট্য হলো অন্য কেউ যদি একই পদ্ধতিতে গবেষণা করেন, তবে তিনিও প্রায় একই ফলাফল পাবেন।

৭. ধৈর্য ও অধ্যবসায়: গবেষণা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। সঠিক ফলাফল পাওয়ার জন্য গবেষককে অসীম ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।

উপসংহার: সর্বশেষ, উপরিউক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সংজ্ঞার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে গবেষণা এমন একটি উদ্যোগ যার মধ্যে সমস্যা, লক্ষ্য, কৌশল, নকশা, পদ্ধতি, উপাত্ত সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিশ্লেষণ প্রতিবেদন প্রণয়ন প্রভৃতি বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রমের সুষ্ঠু পন্থাকে উল্লেখিত হতে দেখা যায়।

আরও জানুন- সামাজিক গবেষণা সংজ্ঞা ও বিভিন্ন স্তরসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন