মাদকাসক্তির কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর

মাদকাসক্তির কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর

মাদকাসক্তির কারণ ও ফলাফল আলোচনা

ভূমিকা:- মাদকাসক্তি একটি ব্যতিক্রমধর্মী সমস্যার পিছে বহুবিধ কারণ বিদ্যমান। এসব কারণ সমাজ থেকে উদ্ভুত।

মাদকাসক্তির কারণ ও ফলাফল আলোচনা

মাদকাসক্তির কারণসমূহ:

নিম্নে মাদকাসক্তির বিভিন্ন কারণসমূহ আলোচনা করা হলো-

১। মাদকদ্রব্যর সহজলভ্যতা

মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ হলো মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা।আমাদের দেশে খুব সহজেই মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়। মাদকদ্রব্যের মধ্যে হিরোইন সবাই ব্যবহার করে। এমনকি নিম্ন শ্রেণীর লোকজনের মধ্যে ও এর ব্যবহার রয়েছে।

২। দারিদ্র্য

দারিদ্র্যের কষাঘাতে ক্ষণিকের জন্য মানুষ কষ্টকে ভূলতে চায়। বিশেষ করে রিক্সাচালক, ঠেলাগাড়ি চালক, দিনমজুর, শ্রমিক এ শ্রেণীর লোকেরা নেশা আতীয় দ্রব্য সেবন করে আরাম পেয়ে থাকে।

৩। কৌতুহল

মাদক আসক্তির অন্যতম আরও একটি কারণ হলো কৌতুহল। কৌতুহল বশে অনেকেই প্রথমে মাদক গ্রহণ করে ।অনেক সময় রোমাঞ্চকর অনুভূতি উপলব্ধি করা জন্য প্রথমে অনেকেই মাদকদ্রব্য সেবন করে। পরবর্তীতে মাদক গ্রহনের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে এ মাদকাসাক্ত অবস্থা হতে আর বের হতে পারে না। 

৪। মূল্যবোধের অবক্ষয়

সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে যুবসমাজ হতাশা গ্রস্থ হয়ে পড়ে এবং তারা হতাশা হতে মুক্ত হওয়ার জন্য মাদক সেবনে যুক্ত হয়ে পড়ে।

৫। অস্থিতিশীল পরিবেশ

এদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অন্যদিকে সামাজিক অক্ষয় যুবকদেরকে চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

৬। বন্ধুমহলের প্রভাব

মানুষ সামাজিক জীব হওয়ায় বন্ধুমহলের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিশোর ও যুবসমাজ অনেক সময় বন্ধুদের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে মাদক গ্রহণ শুরু করে। শুরুতে আনন্দ বা কৌতূহল থেকে গ্রহণ করলেও ধীরে ধীরে তা অভ্যাসে পরিণত হয় এবং এক সময় আসক্তিতে রূপ নেয়।

৭। পারিবারিক অবহেলা ও অশান্তি

পরিবারে ভালোবাসা, সঠিক দিকনির্দেশনা ও শাসনের অভাব থাকলে সন্তানরা মানসিকভাবে একাকিত্বে ভোগে। পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ বা অবহেলার ফলে তারা ভুল পথে পরিচালিত হয় এবং মাদককে আশ্রয় হিসেবে বেছে নেয়।

৮। বেকারত্ব

কর্মসংস্থানের অভাবে যুবসমাজ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অলস সময় ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অনেকেই মাদক গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যা ধীরে ধীরে নেশায় পরিণত হয়।

৯। মানসিক চাপ ও হতাশা

পরীক্ষায় ব্যর্থতা, প্রেমে ব্যর্থতা, পারিবারিক সমস্যা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা মানুষকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে। এসব চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে অনেকে মাদক গ্রহণ করে, যা পরে মারাত্মক আসক্তিতে রূপ নেয়।

১০। গণমাধ্যম ও অপসংস্কৃতির প্রভাব

কিছু চলচ্চিত্র, নাটক ও সামাজিক মাধ্যমে মাদককে আধুনিকতা বা স্টাইল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে তরুণ সমাজ বিভ্রান্ত হয়ে মাদক গ্রহণকে স্বাভাবিক বা আকর্ষণীয় মনে করে।

উপরিউক্ত কারণ ছাড়াও আরো কিছু কারণ রয়েছে সেগুলি হলো- প্রেম প্রত্যাখ্যান, আনন্দলাভ, অনুকরণ, অতিরিক্ত পরিশ্রম ইত্যাদি মাদকাসক্তির জন্য দায়ী।

মাদকাসক্তির প্রভাব বা ফলাফল

মাদকাসক্তি আমাদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নিম্নে সেগুলি আলোচনা করা হলো।

১। ব্যক্তির উপর প্রভাব

মাদকাসক্তি ব্যক্তির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।মাদকদ্রব্য সেবনের ফলে ব্যক্তি ধীরে ধীরে বিপন্ন হয়ে পড়ে। এমনকি এক সময় ব্যক্তি অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে যা মাদকাসক্তির নেতিবাচক প্রভাব।

২। পরিবারের সুখ শান্তির উপর প্রভাব

মাদকাসক্ত ব্যক্তি তার পরিবারের সুখ-শান্তি বিনষ্ট করে ফেলে। পরিবারের কেউ যদি মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে তাহলে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা সমাজের দ্বারা হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়। ফলে পরিবারের সুখ শান্তি বিনষ্ট হয়। 

৩। অপরাধ সৃষ্টি

আমাদের দেশের নানা ধরনের অপরাধের জন্ম হচ্ছে মাদকাসক্তির আসক্তের ফলে। মাদকদ্রব্য সেবনের ফলে ব্যক্তির মানসীকতা ধীরে ধীরে বিনষ্ট হয়ে যায়। ফলে মাদকাসকবত ব্যক্তি খুন, সিনতাই, রাহাজানি, ডাকাতির মত অপরাধ করে থাকে।

৪। অর্থনীতির উপর প্রভাব

মাদকাসক্তি আমাদের অর্থনীতির উপর গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে ধীরে ধীরে সে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এমনকি মাদকদ্রব্য আমদানির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় হয় এবং ব্যক্তির অর্থনীতিতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।

৫। এইডস-এর প্রভাব

মাদকাসক্তি ব্যক্তির এইডস এর উপর মাদকাসক্তি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কেননা মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা দল বেধে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে। ফলে দলের কারো এইডস থাকলে অন্য ব্যক্তির দেহে সে ভাইরাস সহজে প্রবেশ করতে পারে। এইভাবে মাদকাসক্ত ব্যক্তি এইডস-এর সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৬। শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতি

দীর্ঘদিন মাদক সেবনের ফলে লিভার সিরোসিস, কিডনি বিকল, হৃদরোগ ও স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়। শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে।

৭। মানসিক রোগ সৃষ্টি

মাদকাসক্ত ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, হ্যালুসিনেশন, স্মৃতিভ্রংশ এবং আত্মহত্যাপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

৮। শিক্ষাজীবনের ক্ষতি

মাদকাসক্ত শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ হারায়। পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল, বিদ্যালয় ত্যাগ এবং ভবিষ্যৎ জীবনে ব্যর্থতা তাদের জীবনে নেমে আসে।

৯। সামাজিক অবক্ষয়

মাদকাসক্ত ব্যক্তি সমাজে সম্মান হারায় এবং পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে সামাজিক শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা ভেঙে পড়ে।

১০। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার হুমকি

মাদক চোরাচালান, সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে দুর্বল করে। এতে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন ব্যাহত হয়।

সর্বশেষ বলা যায় মাদকাসক্তির প্রভাব আমাদের দেশ ও জাতির জন্য এক ভয়ানক অভিশাপ। মাদকাসক্তির প্রভাবে আমাদের যুব-সমাজ আজ ধ্বংসের পথে।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post