গ্রামীণ পরিবারের পরিবর্তনের ধারাসমূহ আলোচনা
ভূমিকা:- গ্রামীণ সমাজ হলো একটি দেশের সামগ্রিক কাঠামোর ভিত্তি। আর গ্রামীণ সমাজের প্রাণকেন্দ্র হলো 'পরিবার'। পরিবারের ওপর নির্ভর করেই গড়ে ওঠে গ্রামীণ সমাজের আদর্শ, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি। তবে সময়ের পরিক্রমায় গ্রামীণ পরিবার প্রথার মধ্যে আজ ব্যাপক ও বহুমুখী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে আধুনিক শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে উত্তরণের ফলে গ্রামীণ পরিবারের ধরন, গঠন এবং কার্যাবলিতে এই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। একটি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গ্রামীণ পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম হলেও বর্তমানে এটি এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একটি দেশের আর্থ সামাজিক সকল উন্নয়নে পরিবার বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে।
গ্রামীণ পরিবারের পরিবর্তনের ধরণসমূহ
নিম্নে গ্রামীণ সমাজেরপরিবর্তনের কয়েকটি ধারা তুলে ধরা হলো-
১। একক পরিবার গঠন
আমাদের দেশে গ্রামীণ সমাজে নানা ধরনের পরিবর্তনের মাধ্যমে একক পরিবার রুপ নিয়েছে। কারণ, আজ যৌথ পরিবার ভেঙে আধুনিক একক পরিবার স্থান করে নিয়েছে। তাই আধুনিক যুগে একক পরিবার গঠন অন্যতম একটি সামাজিক পরিবর্তন।
২। সিদ্ধান্ত গ্রহণ
এমন একটা সময় ছিলো যখন মেয়েরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারতো না।কিন্তু বর্তমানে যে কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে অনেক এগিয়ে।
৩। সমান শিক্ষার অধিকার
এক সময় ভাষা হতো যে মেয়েদের শিক্ষার কোন দরকার নেই। কিন্তু বর্তমানে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এ ধারনা পাল্টে গিয়েছে। কারণ, বর্তমানে ছেলে মেয়ে উভয়ের জন্য সমান শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিটি পরিবার করে থাকে। যা সমাজ পরিবর্তনে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে।
৪। সমঅধিকার
বর্তমানে প্রতিটি পরিবার তার মেয়ে সদস্যদের সমঅধিকার নিশ্চিত করছে। কারণ, নারী হলো সমাজ গঠনের অন্যতম সদস্য। তাই নারীকে সকল কাজে যথাযথ সুযোগ সুবিধা প্রদান করে সমাজের উন্নয়নে কাজ করতে হবে। তাহলে দেমের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে।
৫। প্রযুক্তির ক্ষেত্র
আগে পরিবারের কেই আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তেমন ধারনা ছিলো না। কিন্তু বর্তমানে প্রতিটি পরিবারের প্রতিটি সদস্য আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থা সম্পর্কে অনেক সচেতন।
৬। নেতৃত্ব
বর্তমানে পরিবারের যে কোন সদস্য যে কোন নেতৃত্বে আসতে পারে। বর্তমানে একই পরিবারের সকলেই ভিন্ন ভিন্ন রাজনীতি পছন্দ করতে পারে।
৭। অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার পরিবর্তন:
আগে পরিবারের সব সদস্যই পরিবারের প্রধানের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল থাকত। এখন পরিবারের ছোট সদস্যরাও বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা বা বিদেশে শ্রম বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছে, যা পরিবারের চিরাচরিত অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমিয়ে দিয়েছে।
৮। বিয়ের ক্ষেত্রে পরিবর্তন:
বিয়ের ক্ষেত্রে আগে পরিবারই সব সিদ্ধান্ত নিত। বর্তমানে ছেলে-মেয়েরা নিজের পছন্দে বিয়ে করছে।
৯। প্রজনন ও পরিবার পরিকল্পনায় সচেতনতা:
পূর্ব যুগে অধিক সন্তানকে আশীর্বাদ মনে করা হতো। এখন পরিবার পরিকল্পনার বিষয়ে সচেতনতা এসেছে। কম সন্তান, সুস্থ পরিবার এই ধারণা গ্রহণ করেছে অধিকাংশ গ্রামীণ পরিবার।
১০। অভিবাসন ও প্রবাস জীবনের প্রভাব:
বর্তমান অনেক পরিবারের সদস্যরা বিদেশে কাজ করতে যাচ্ছে। এতে অর্থনৈতিক উন্নতি যেমন হচ্ছে, তেমনি পরিবারেও নতুন চিন্তাভাবনার সূচনা হচ্ছে।
১১। পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা:
গ্রামীণ পরিবারগুলো এখন পরিচ্ছন্নতা, টয়লেট ব্যবহার, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সচেতন হয়েছে। স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রসার এবং মিডিয়ার ভূমিকা এই পরিবর্তনে সহায়ক হয়েছে।
উপরের আলোচনা হতে পরিশেষে বলা যায় যে, পরিবার হলো সমাজ গঠনের প্রধান হাতিয়ার। তাই সমাজ যদি কোন কারণে পরিবর্তন হয় তবে পরিবারও পরিবর্তন হবে। কারণ পরিবার ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক।
