কার্ল মার্কসের সমাজদর্শন বা মার্কসবাদের মূলনীতি
ভূমিকা:- সমাজ বিকাশ ও উৎপাদন ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে কার্ল মার্কস যে তত্ত্ব প্রদান করেছেন তাই মার্কসীয় তত্ত্ব। অন্যভাবে বলা যায় যে, সমাজ বিবর্তনের সাথে উৎপাদন ব্যবস্থায় দুটি শ্রেণী বিদ্যমান একটি হলো শ্রমিক শ্রেণী অন্যটি মালিক শ্রেণী।
শ্রমিক শ্রেণী উৎপাদন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তারা নায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। ফলে শ্রমিকের সাথে মালিকের দ্বন্দ্ব দেখা যায়। আর এ ধরনের দ্বন্দ্ব থেকে রুপ নেয় সংগ্রামের। এ মূল বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কার্ল মার্কসের (Karl Marx) মার্কসীয় তত্ত্ব। কোন সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা কোনো একটি শ্রেণীর অনুকূলে কাজ করে।
কার্ল মার্কসের সমাজদর্শন বা মার্কসবাদের মূলনীতি
সমাজ দর্শনে কার্ল মার্কস (Karl Marx) এর সবচেয়ে বড় অবদান হলো সমাজতন্ত্রকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করা। কার্ল মার্কসের সমাজদর্শন ইউরোপিয়ান সমাজতন্ত্রের অবাস্তব ও কাল্পনিক গন্ডি থেকে সমাজকে মুক্ত করেন। কার্ল মার্কসের তত্ত্ব কতকগুলো মূলনীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। নিম্নে কার্ল মার্কসের মূলনীতিসমূহ আলোচনা করা হলো-
১। শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা
কার্ল মার্কস (Karl Marx) এর তত্ত্বের অন্যতম একটি মূলনীতি হলো শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ সমাজতন্ত্রে মূল লক্ষ্যেই হলো শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। শ্রেণিহীন সমাজ ব্যবস্থায় দরিদ্রের অবসান ঘটে এবং শাসক ও শোষণ ব্যবস্থার অবসান ঘটে।
২। রাষ্ট্রে বিলোপ সাধন
কার্ল মার্কস (Karl Marx) এর তত্ত্বের অন্য আরেকটি মূলনীতি হলো রাষ্ট্রের বিলোপ সাধন। সর্বহারা শ্রেণিদের দ্বারা যখন একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে তখন কোনো মানুষের মাঝে আর কোন ভেদাভেদ থাকবে না। অর্থাৎ সবধরনের শ্রেণি বৈষম্য অবসান হবে। শ্রেণি বৈষম্যর পরিপূর্ণ বিলোপসাধনের মধ্যদিয়ে শ্রেণিহীন সমাজের প্রতিষ্ঠা হয়। আর এক সময়ে রাষ্ট্রের প্রয়োজন শেষ হয় বলে রাষ্ট্রের বিলোপ ঘটে।
৩। শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কতন্ত্র
শ্রেণি বা শ্রেণিদের একনায়কতন্ত্রকে কার্ল মার্কসের সমাজ দর্শন বা মাকর্সবাদের মূলনীতি হিসেবে চিহিৃত করা হয়। ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ সাধনের ফলে সমাজে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। আর ব্যক্তিগত সম্পত্তির তখনই বিলোপ ঘটে যখন কোনো সংগ্রামের ফলে পুঁজিবাদী তাদের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে এবং ক্ষমতা চলে যাবে শ্রমিক সর্বহারাদের হাতে।
৪। ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা
বস্তুই হলো চরম সত্য একথাটাই মার্কসবাদের মূল কথা। কেননা কোনো বস্তু থেকেই প্রাণ, মন, চেতনার সৃষ্টি। এছাড়া বস্তুই সামাজিক ও মানসিক সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে।অপরপক্ষে উৎপাদন ব্যবস্থার দ্বারাই ইতিহাসের সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। কেননা উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটলে সামাজিক পরিবর্তন হয়।
৫। শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্ব মতবাদ
কার্ল মার্কস (Karl Marx) এর তত্ত্বের মতে সমাজে যে উৎপাদন পদ্ধতির সৃষ্টি হয়েছে তার উপর ভিত্তি করেই মুলত দুটি শ্রেণির উদ্ভব হয়।যার মধ্যে একটি হলো শাসক শ্রেণি অন্যটি শোষিত শ্রেণি। এ দুটি শ্রেণির স্বার্থ বিপরীত হওয়ায় তাদের মধ্য দ্বন্দ্ব সংঘাত সবসময় লেগে থাকে। যার ফলে শ্রেণি সংগ্রাম সমাজের রুপান্তর ঘটায়। আর তাদের হারজিতের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যবস্থার দ্বারা নতুন সমাজের গোড়াপত্তন ঘটে।
৬। সমাজবিপ্লব
সমাজ বিপ্লবকে কার্ল মার্কস তত্ত্বের অন্যতম একটি মূলনীতি হিসেবে চিহিৃত করা হয়। সমাজ বিপ্লব বলতে পণ্যের মূল্য পুঁজিপতিদের হাতে থাকার কারণে যখন মধ্যবিত্ত ও শ্রমিক ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং ক্রয় শক্তির অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদিত হবে। অপ্রত্যাশিত চাহিদা কমে যাওয়া ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পাওয়াকে বোঝায়।
৭। উদ্ধৃত্ত মূল্য মতবাদ
কার্ল মার্কস (Karl Marx) তত্ত্বের অন্য আরেকটি মূলনীতি হলো উদ্ধৃত্ত মূল্য মতবাদ। শ্রমিকরা উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য শ্রম দেয় তবে শ্রমের উপযুক্ত মূল্য শ্রমিকরা পায়না বা তাদের দেওয়া হয়না। উদ্ধৃত্ত মূল্য মতবাদ বলতে দ্রব্যের বিক্রয়মূল্য এবং দ্রব্য উৎপাদনের জন্য শ্রমিকরা যে মজুরি পায় তার পার্থক্যকে উদ্ধৃত্ত মূল্য তত্ত্ব।
মার্কসের শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হলো তার উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব। মার্কসের মতে, শ্রমিক যা উৎপাদন করে তার যথার্থ মূল্য সে লাভ করে না। শ্রমিকের শ্রম উৎপাদিত দ্রব্যমূল্যের এক বিরাট অংশ পুঁজিপতি শ্রেণি তথ্য উৎপাদনের উপায়ের মালিক শ্রেণি আত্মসাৎ করে। অথচ তার মতে, শ্রমই যেহেতু উৎপাদনের একমাত্র উপাদান সেহেতু উৎপাদিত দ্রব্যের সম্পূর্ণ মূল্যই শ্রমিকের প্রাপ্য। কিন্তু শ্রমিক তার শ্রম দ্বারা উৎপাদিত পণ্যের সামান্যই পেয়ে থাকে। শ্রমিক যা উৎপাদন করে তার সর্বমোট মূল্য এবং এর বিনিময়ে শ্রমিক মজুরি হিসেবে যা গেয়ে থাকে এ দুয়ের ব্যবধানকেই যল্য হয় উদ্বৃত্ত মূল্য। যেমন একটি কাপড়ের কারখানায় বহরে ১৫ লাখ টাকার কাপড় বিক্রি হলো। যেখানে উৎপাদন খরচ (কাঁচামাল শ্রমিকের মজুরি অন্যান্য)= ১১ লাখ টাকা। বাকি ৪ লক্ষ টাকা মুনাফা হিসেবে মালিকের পকেটে গেল। এটাই হলো উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব।
৮. ঐতিহাসিক বস্তুবাদ
মার্কসবাদ যে সকল তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দন্ডায়মান তার মধ্যে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অন্যতম। মার্কস তার এই তল্লাটি দাঁড় করিয়েছেন German classical philosophy কে উৎস করে। পুঁজিবাদের প্রেক্ষাপটে শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটলে পুঁজিপতিদের সাথে শ্রমিক শ্রেণির দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। এ কারণে মার্কস শ্রমিক শ্রেণিকে সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে একটি বৈজ্ঞানিক ও শুদ্ধ বৈপ্লবিক তত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এ তত্ত্বই হলো ঐতিহাসিক বস্তুবাদ।
ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সামগ্রিকভাধে সমাজ বিকাশের সাধারণ দিকগুলো তথা সমাজ কাঠামো, সমাজ জীবনের বিভিন্ন দিকের মিথস্ক্রিয়া এবং সমাজ বিকাশের সাধারণ নিয়ামাবলি ও চালিকাশক্তিগুলো বিশ্লেষণ করে। মার্কসের মতে, ইতিহাসে মুগে যুগে সমাজের নিরন্তর পরিবর্তন ও সক্রিয় রূপান্তরশীলতার মধ্যে শ্রেণিসংযাত পরিলক্ষিত হয়। অধিকন্তু সমাজ জীবনে পরিবর্তনের গতিবেগ ক্রমবর্ধমান। সমাজের শ্রেণিগুলোর মধ্যে বিদ্যমান এই বিরোধ ও সংঘর্ষের ফলে সমাজ পরিবর্তিত, বিকশিত ও উন্নত হয়। সাধারণভাবে সমাজের এই পরিবর্তন ও বিকাশের মূলে যে নিয়ন্তা শক্তি বা বিধিবিধান পরিলক্ষিত হয় সে বিষয়ে সাধারণ তত্ত্বই হলো ঐতিহাসিক বস্তুবাদ।
৯. দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ:
সাধারণভাবে দ্বন্দ্ব বলতে দুটি পরস্পরবিরোধী শক্তির সংঘাতজনিত প্রক্রিয়াকে বোঝায়। আর দ্বান্দ্বিকতার অর্থ হলো বিরোধসমূহের মিলনতত্ত্ব। দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার কথা সর্বপ্রথম বলেন, ভাববাদী জার্মান দার্শনিক হেগেল। মার্কস তার দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের ধারণাটি হেগেলের দ্বান্দ্বিক ভাববান থেকে লাভ করেছেন। মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের ততই তার সমগ্র দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সারকথা হলো সমস্ত বস্তুর বা প্রপঞ্চের বিকাশ হয় দ্বন্দ্বের কারণে। সমাজ পরিবর্তনের মূল কারণ দ্বন্দ্ব। তার মতে, সমাজে বিদ্যমান পুরাতন অবস্থা তথা (বাদ= Thesis) এর সাথে দ্বন্দ্ব চলে, তার বিপরীত অবস্থা তথা (প্রতিবাদ= Antithesis) এবং এরই ফলে একটি সম্পূর্ণ নতুন অবস্থার সৃষ্টি হয় তথ্য (সমন্বয়= Synthesis) এই Synthesis কালক্রমে পুরানো অবস্থায় পরিণত হয় এবং তার বিপরীত অবস্থার সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। দ্বন্দ্বের ফলস্বরূপ পুনরায় একটি Synthesis সৃষ্টি হয়। এভাবে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি, বস্তু এবং সমাজের উৎপত্তি, বিকাশ এবং পরিবর্তন ঘটে। এটাই হলো মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের তত্ত্ব।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, কার্ল মার্কসের তত্ত্বের মূলনীতিসমূহ থেকে কার্ল মার্কস (Karl Marx) তত্ত্বের ধারণা পাওয়া যায়। কেননা কার্ল মার্কস (Karl Marx) তত্ত্বটি একটি বাস্তবভিত্ত্বিক জ্ঞান দান করে ।কার্ল মার্কস (Karl Marx) তত্ত্বের মূল যে বিষয়টি সেটা হলো শাসক শ্রেণি ও শোষিত শ্রেণি এর মধ্যে দ্বন্দ্ব বা সংঘাত। কারণ, এ অবস্থা থেকে সমাজে শ্রেণি সংগ্রামের সূচনা হয়।
%20%E0%A6%8F%E0%A6%B0%20%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%A6%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B6%E0%A6%A8.webp)