ফ্যাসিবাদ কী? ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর
ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা
ভূমিকা:- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যে কয়েকটি মতবাদের সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে ফ্যাসিবাদের মতবাদ অন্যতম। ফ্যাসিবাদ মতবাদ একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী মতবাদ।
ফ্যাসিবাদ
ফ্যাসিবাদের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Fascism শব্দটি ল্যাটিন শব্দ Fascia থেকে এসেছে। এই শব্দটির অর্থ হলো এক বোঝা লাটির সাথে একটি কুঠার। সাধারণত ফ্যাসিবাদ একটি প্রসারিত কুঠার ফলক যা ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রতীক। Fasic শব্দটি ছিলো ঐক্য,সংহতি এবং কর্তৃত্বের প্রতীক। প্রাচীন রোমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীকরূপে এক বোঝা লাঠির সাথে একটি কুঠার বাঁধা থাকত। সাধারণত শক্তিশালী কর্তৃত্ব বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হত।
প্রামাণ্য সংজ্ঞাসমূহ
বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন তা নিম্নরূপ-
অধ্যাপক সেবাইনের মতে “ফ্যাসিবাদ হলো পরিস্থিতির প্রয়োজনীয়তা অনুসারে বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন ভাবধারার সমন্বয়।”
মরিস ক্রাসটন এর মতে “ফ্যাসিবাদে হেগেলের অধিবিদ্যামূলক চিন্তাধারা েএবং সরলের সক্রিয়তাবাদী মতবাদের সমন্বয় ঘটেছে।”
এতএব বলা যায় যে ফ্যাসিবাদ হলো এমন একটি মতবাদ যা পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইন কানুন তৈরি করে।
ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ
ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য: তৎকালীন সময়ে ফ্যাসিবাদের প্রয়োজন অনেক বেশি পরিমাণে ছিলো। ফ্যাসিবাদের বিশেষ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো।
১। গণতন্ত্র বিরোধী
ফ্যাসিবাদ ছিলো গণতন্ত্রবিরোধী, এই শাসন ব্যবস্থা অনেকটা এক নায়কতন্ত্রের মতই।
২। ব্যক্তিগত স্বাধীনতাহীনতা
ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থাকবে না।
৩। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগত মালিকানা
ফ্যাসিবাদে সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা থাকে, তবে তা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন।
৪। স্বাতন্ত্রবাদের বিলোপ
সম্পদ ও ক্ষমতা সবকিছুই রাষ্ট্র কেন্দ্রিক। স্বাতন্ত্রবাদ বলতে কোনো জিনিস নেই ফ্যাসিবাদে।
৫। শ্রেণি বৈষম্য
ফ্যাসিবাদে শ্রেণি বৈষম্য বিদ্যমান।
৬। সমাজতন্ত্র বিরোধী
ফ্যাসিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সমাজতন্ত্র বিরোধী। এই শাসন ব্যবস্থা সমাজতন্ত্রকে স্বীকার করে না।
৭। নারী স্বাধীনতা বিরোধী
ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রে নারীর স্বাধীনতাকে স্বীকার করা হয় না।নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমান অধিকারের বিষয়টি ফ্যাসিবাদে উপেক্ষা করা হয়।
৮। এলিট শাসনে বিশ্বাসী
ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রে এলিট শাসনে বিশ্বাসী। তারা মনে করেন কিছু মানুষের জন্ম হয়েছে শাসন করার জন্য কিছু মানুষের সৃষ্টি হয়েছে শাসিত হওয়ার জন্য তারা এটি মনে করে।
৯। চরম জাতীয়তাবাদ:
ফ্যাসিবাদী মতবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো চরম জাতীয়তাবাদ। এই মতবাদে নিজ জাতিকে শ্রেষ্ঠ ও অন্য জাতিগুলোকে নিকৃষ্ট মনে করা হয়।
১০। সামরিকীকরণ:
ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে সামরিক বাহিনীকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই ধরনের রাষ্ট্রে যুদ্ধকে গৌরবজনক মনে করা হয় এবং জনগণকে সবসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়।
১১। বিরোধী মত দমন:
ফ্যাসিবাদী শাসনে ভিন্নমত সহ্য করা হয় না। যারা সরকারের বিরোধিতা করে, তাদের দমন করা হয়।
১২। একনায়কতান্ত্রিক নেতৃত্ব:
ফ্যাসিবাদে একজন নেতাই সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হন। তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং কোনো গণতান্ত্রিক পরামর্শ বা অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না।
১৩। রাষ্ট্রের উপর ব্যক্তির অধীনতা:
ফ্যাসিবাদে ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র বড়। নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বার্থকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের নিচে আনতে বাধ্য করা হয়।
১৪। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ
ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিওসহ সব গণমাধ্যম রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকে। সরকারবিরোধী সংবাদ প্রচার নিষিদ্ধ থাকে এবং প্রচারণার মাধ্যমে শাসকের ভাবমূর্তি তৈরি করা হয়।
১৫। আইন ও বিচার বিভাগের উপর নিয়ন্ত্রণ
ফ্যাসিবাদে বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকে না। আইনকে শাসকের স্বার্থে ব্যবহার করা হয় এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার ও শাস্তি দেওয়া হয়।
১৬। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ
এ শাসনব্যবস্থায় একটিমাত্র দল বা মতবাদকে বৈধ মনে করা হয়। অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নিষিদ্ধ বা ভেঙে দেওয়া হয়।
১৭। ধর্ম ও সংস্কৃতির অপব্যবহার
অনেক ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদে ধর্ম, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অপব্যবহার করে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে জনগণকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, ফ্যাসিবাদ মূলত একচেটিয়া শাসন ব্যবস্থা। সম্পদ ও ক্ষমতার উপরে শাসক একচেটিয়াভাবে আধিপত্য বিস্তার করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ফ্যাসিবাদ শেষ পর্যন্ত সমাজে দমন-পীড়ন, সহিংসতা ও ধ্বংস ডেকে আনে। তাই একটি সুস্থ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য ফ্যাসিবাদ পরিহার করা অপরিহার্য।

Comments
Post a Comment