বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি কর্মসূচিসমূহ কী কী
বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি কর্মসূচিসমূহ
ভূমিকা:- ১৬ কোটি জনসংখ্যার এই বাংলাদেশ বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে একটি দেশ। বাংলাদেশে চরম দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী দেখা যায় ১২.৯ শতাংশ।
সাধারণ অর্থে আমরা দারিদ্র্য বলতে অভাব অনটনকে বুঝি। কোন ব্যক্তি যদি অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল থাকে তখন তাদেরকে আমরা দরিদ্র বলে থাকি। দারিদ্র্য সমস্যা শুধু বাংলাদেশে না এটা গোটা বিশ্বে বর্তমানে একটি বড় সমস্যা। মানুষের মৌলিক চাহিদা যেমন- খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও আশ্রয় ইত্যাদি মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় সকল অসম্পূর্ণ বা অনুপস্থিতি অবস্থাকেই দারিদ্র অবস্থা নির্দেশ করা হয়।
বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি পদক্ষেপ/ কর্মসূচিসমূহ
নিম্নে বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি কর্মসূচীর কয়েকটি কারন তুলে ধরা হলো-
১। সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি
দুস্থ, অসহায়, বৃদ্ধ, অক্ষম, বিধবা, এতিম এদের জন্য ভাতা, অবসর ভাতা, ভবিষ্যৎ তহবিল, কল্যাণ তহবিল, শ্রমিক ক্ষতিপূরণ, মাতৃত্ব সুবিধা প্রভৃতি কার্যক্রম সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্তর্ভূক্ত।
২। বয়স্কভাতা কর্মসূচি
বয়স্কদের জন্য বয়স্ক ভাতার প্রচলন করতে হবে। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে মাথাপিছু মাসিক ভাতার পরিমাণ ৩০০ টাকা ও উপকার ভোগীর সংখ্যা ছিল ২৪.৭৫ লক্ষ। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এ কার্যক্রমে ৮৯১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
৩। নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি
দেশের অতি দরিদ্র লোকজনের জন্য বাজেটে নিরাপত্তা বেষ্টনী নামে একটি বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ভিজিডি, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, টি আর ডিপি, জি আর, টি আর প্রভৃতি কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রচেষ্টা চলছে।
৪। অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা প্রদান
অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধারা ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতায় উপকার ভোগ করেন ১.৫০ লক্ষ, মাসিক ভাতার পরিমাণ ২০০০ টাকা উন্নীত করা হয়েছিল। এ বাবদ ৩৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
৫। একটি ঘর একটি খামার
দারিদ্র্যতা দূরীকরনের জন্য প্রতিটি বাড়িতে একটি খামার গড়ে তোলার নিমিত্তে ২০০৯ সালে একটি খামার একটি বাড়ি প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। এ প্রকল্পটি পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অধীনস্থ। এ প্রকল্পটি ১,১৯৭.০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চালু করার প্রচেষ্টা চলছে। এর বাস্তবায়নকাল ২০০৯ থেকে ২০১৪ জুন পর্যন্ত।
৬। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি
খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়াধীন এ কর্মসূচির আওতায় ২০১২-১৩ অর্থ বছরে ৮১.৯৬ লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ করা হয়।
৭। সমাজসেবা
দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক সমাজসেবা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শিশু কল্যাণ, গ্রামীণ ও শহর সমাজসেবা, নারী কল্যাণ, হাসপাতাল সমাজসেবা, যুব কল্যাণ, প্রতিবন্ধী কল্যাণ, জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি কার্যক্রমসমূহ।
৮। আবাসন প্রকল্প
বাংলাদেশের ৬৫ হাজার ভূমিহীন, গৃহহীন ও ছিন্নমূল মহিলাদের জন্য মোট ৬৫৭.২০ কোটি টাকার ব্যয় সম্বলিত আবাসন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
৯। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম
সমবায় সমিতি গঠনের মাধ্যমে মহিলাদের জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, শিশুদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র, কর্মজীবী মহিলাদের জন্য বিক্রয় ও প্রদর্শনী কেন্দ্র প্রভৃতি কার্যক্রম পরিচালিত করছে।
১০। কর্মসংস্থান ব্যাংক
মূলত যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য এই ব্যাংক স্থাপিত হয়। দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলায় এ ব্যাংক তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। যুবকদের এরা স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্য কাজ করছে।
১১। ভিজিএফ (VGF) কর্মসূচি
দুর্যোগকালীন সময়ে অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এটি একটি কার্যকর উদ্যোগ।
১২। বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত মহিলা ভাতা
দরিদ্র বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত মাসিক ভাতা প্রদান করা হয়, যা তাদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
১৩। প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচি
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান করছে, যা তাদের চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবনযাত্রায় সহায়তা করে।
১৪। শিক্ষা উপবৃত্তি ও উপবৃত্তি কর্মসূচি
দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য ও গরীব-দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে উপবৃত্তি ও বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হয়। ফলে দারিদ্র বিমোচনের পাশাপাশি দারিদ্র পরিবারের সন্তানেরাও শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়।
১৫। মাইক্রোক্রেডিট ও ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF) ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বল্পসুদে ঋণ প্রদান করে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
সর্বশেষ বলা যায় উপরোক্ত কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমে আমাদের দেশে বর্তমানে বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য কাজ করা হচ্ছে। এসব কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে দারিদ্র্যের হার আরও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

Comments
Post a Comment