বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাব আলোচনা কর

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাব আলোচনা

ভূমিকা:- বর্তমান বিশ্বে বিশ্বায়ন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। আমাদের দেশের অর্থনীতিতে পণ্ডিত থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পর্যন্ত প্রত্যেকেই দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি পরিচালনায় বিশ্বায়নের কথা উল্লেখ করেন। ৮০ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশ পুরোপুরি নীতি হিসাবে বাজার অর্থনীতি গ্রহণ করেন। ফলে উদারীকরণ কাঠামোগত সংস্কার সরকারের আয় ব্যয় সমন্বয় ইত্যাদি কর্মসূচি বাংলাদেশের অর্থনীতি বাস্তবায়নের চেষ্ট করছে। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশ কিছু ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাব

বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাবসমূহ

বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশ কিছু ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো-

১। অর্থ বাজারে উন্নয়ন

বিশ্বায়নের প্রভাবের ফলে দেশের অর্থ বাজারে প্রাণ সঞ্চয় হয়েছে। এ দেশে অনেক বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসকল ব্যাংক গুলির শাখারও ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। বিশ্বায়নের পেক্ষাপটে সরকারের উদার অর্থনৈতিক কর্মসূচি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়ন করেছে।

২। রপ্তানি বৃদ্ধি

বিশ্বায়ন তথা বাজার অর্থনীতির ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সস্তায় বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অধিক মাত্রায় রপ্তানি মুখী শিল্প স্থাপনে এগিয়ে আসছে । ফলের আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

৩। আন্তর্জাতিক মান

পূর্বে বাংলাদেশে সংরক্ষিত বাণিজ্য প্রচলিত ছিলো ফলে দেশীয় শিল্প সমূহের আন্তর্জাতিক মান অনেক ক্ষেত্রেই ছিলো না। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বায়নের ফলে বিদেশী শিল্পের সাথে প্রতিযোগিতার ফলে দেশি শিল্প সমূহ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হচ্ছে যা শুধু বিশ্বায়নের ফলেই সম্ভব হয়েছে।

৪। উন্নত প্রযুক্তি

বিশ্বের শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা তথ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আজ উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশ্বায়নের প্রভাবে উন্নত প্রযুক্তিগুলো আমাদের দেশে আসার ফলে আমাদের জীবন যাত্রা মান ও দিন দিন উন্নত হচ্ছে।

৫। বিদেশি বিনিয়োগ

বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের উদরি বাণিজ্যনীতি, সরকারী বিধি নিশেধ শিথিলকরণ, ব্যাক্তি ও উদ্দোগকে উৎসাহদান প্রভৃতি কর্মসূচি বেসরকারি বিনিয়োগভাবে উৎসাহিত করেছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া তরান্বিত হচ্ছে।

৬। বহিঃগমনমুখী

বিশ্বায়নের প্রভাবের ফলে বাংলাদেশের মানুষ দিন দিন বহিঃগমনমুখী হচ্ছে । উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ হওয়ায় বাংলাদেশের গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে মানুষ বেরিয়ে পড়ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে । ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশে পাঠাতে সক্ষম হচ্ছে।

৭। তথ্য প্রযুক্তি

বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশের তথ্য ও প্রযুক্তিতে ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। টেলিফোন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার জগৎ এ এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। অল্প সময় স্বল্প খরচে এখন বিশ্বের যে কোন জায়গায় যোগাযোগ করা যায় । যা বিশ্বায়নের ফলেই সম্ভব হয়েছে।

৮। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি

বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে রপ্তানি বৃদ্ধি, নতুন বাজারের সন্ধান, বিদেশি ক্রেতাদের আগমন—এসব প্রভাবশালী উপাদান। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্বের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বায়নের ফলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

৯। কর্মসংস্থান সৃষ্টি

বিশ্বায়ন বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অনেক অঞ্চলে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে, যেখানে স্থানীয় শ্রমিকদের চাকরি হয়েছে। এতে গ্রামীণ জনগণের কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। পাশাপাশি, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের আর্থিক অবস্থা পরিবর্তন করেছে।

১০। সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি

বিশ্বায়নের ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ের পথ প্রসারিত হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ, বহুজাতিক কোম্পানির কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বাণিজ্যের উন্নতির কারণে দেশের রাজস্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই রাজস্ব সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সহায়তা করছে।

১১। বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বৃদ্ধি

বিশ্বায়নের কারণে বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ে সহায়ক হচ্ছে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার বাড়ানো দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।

১২। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা

বিশ্বায়নের ফলে আধুনিক প্রযুক্তি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রচলন ঘটেছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারছে। সেমিনার, ওয়েবিনার এবং অনলাইন মিটিংয়ের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা সহজ হয়ে উঠেছে, যা দেশের অর্থনীতির গতিশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।

১৩। দেশীয় বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি

বিশ্বায়নের ফলে বিদেশি পণ্য দেশের বাজারে প্রবাহিত হওয়ার পাশাপাশি, দেশীয় পণ্যও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হচ্ছে। এটি দেশীয় শিল্পগুলোকে আরও উন্নত এবং দক্ষ হতে বাধ্য করছে, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের মান বজায় রাখতে হলে তাদের উৎপাদন পদ্ধতি ও প্রযুক্তিতে ক্রমাগত উন্নতি আনতে হবে।

১৪। অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যতা

বিশ্বায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে। দেশের অর্থনীতি কেবল কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল, কিন্তু বর্তমানে তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, গার্মেন্টস, প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য খাতেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়েছে।

১৫। আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ

বিশ্বায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছে। বিদেশে পড়াশোনা এবং গবেষণা কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নতি আসছে, যার প্রভাব ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্পের ক্ষেত্রে পড়বে। বাংলাদেশের তরুণরা আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জন করছে, যা তাদের কর্মসংস্থানে সুবিধা প্রদান করছে।

১৬। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি

বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সহযোগিতা বেড়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও পলিসি নির্ধারকরা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের পক্ষে আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি করছে। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক সংস্থা বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে, যা দেশের উন্নয়ন এবং দরিদ্রতা বিমোচনে সহায়ক হচ্ছে।

১৭। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা

বিশ্বায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF), বিশ্ব ব্যাংক এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে, যার ফলে দেশে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। স্বচ্ছতা এবং অর্গানাইজেশনাল উন্নতি, বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়িক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে, যা বাজারের স্থিতিশীলতাকে সমর্থন করে।

১৮। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা

বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশের কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উন্নত কৃষি উপকরণ সমূহ দেশে এসেছে। কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেতে সহায়তা করছে বিশ্বায়ন, যা খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উন্নত কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সাহায্য হয়েছে।

১৯। মানবসম্পদ উন্নয়ন

বিশ্বায়ন বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্তার বাংলাদেশের শ্রমিকদের, বিশেষ করে তরুণদের, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করেছে। এর ফলে, বাংলাদেশের শ্রমশক্তি আরও দক্ষ হয়ে উঠছে, যা দেশের উৎপাদনশীলতা এবং আর্থিক সেক্টরে কার্যকর প্রভাব ফেলছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করছে, যার মাধ্যমে স্থানীয় শ্রমিকরা উচ্চমানের প্রযুক্তি এবং জ্ঞান লাভ করছে।

২০। সামাজিক উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যের অগ্রগতি

বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে উন্নতি সাধিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে উন্নতি করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করেছে এবং উদ্ভাবনী চিকিৎসা প্রযুক্তি ও চিকিৎসা সেবার উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এর ফলে, বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে। বিদেশি সাহায্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে টিকা এবং অন্যান্য চিকিৎসা উপকরণের সরবরাহ সহজ হয়েছে, যা স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে।

উপসংহার: বিশ্বায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প, সংস্কৃতি, সামাজিক কাঠামো, এবং পরিবেশে এই পরিবর্তনগুলির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। সমন্বিত পরিকল্পনা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্বায়নের ইতিবাচক দিকগুলোকে সামনে রেখে বাংলাদেশের উন্নয়ন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। সুতরাং বলা যায় যে বিশ্বায়ন বর্তমানে সারা বিশ্বেই ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে।

Comments

Popular posts from this blog

রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর

টার্ম পেপার (term paper) কী? টার্ম পেপার লেখার নিয়ম অনার্স-মাস্টার্স

রাজনৈতিক যোগাযোগ কী? রাজনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্ব