দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কী? দুর্যোগের প্রকারভেদ আলোচনা কর
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কী? দুর্যোগের প্রকারভেদ আলোচনা
ভূমিকা:- দুর্যোগ স্বাভাবিক অর্থে প্রাকৃতিক। তবে দূর্যোগের কাল, ঘটনা, সংখ্যা, ঘটন প্রকৃতি এবং ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপ্তি বিশ্লেষণে তা একই সাথে মানবসৃষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়। এ করণেই দূর্যোগের পরিবেশগত ও সামাজিক উভয় প্রেক্ষাপট আছে। দূর্যোগটাই গ্রামের সবকিচু হারাচ্ছে। আধুনিক বিশ্বে দূর্যোগ সংগঠন একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছে।দূর্যোগের কারণে প্রাণ হারাচ্ছে অনেক মানুষ। তাই দূর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করতে চাইলে আমাদের কার্যকরী কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বলতে বুঝায় দূর্যোগ ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য গৃহীত পদক্ষেপ বা কৌশল।সাম্প্রতিক সময়ে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বলতে প্রাক-দূর্যোগ ও দূর্যোগ পরবর্তী সময়ে ব্যাপক কর্মকান্ড ও নীতিমালার বাস্ত-বায়নকে নির্দেশ করে। এই কর্মকান্ডের মধ্যে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষের দূর্যোগজনিত কষ্ট হ্রাস ও দূর্যোগ প্রতিষেধক, দূর্যোগ উপশম নিবৃত্তি এবং এই পূর্ব প্রস্তুতিকে প্রাক দূর্যোগ মোকাবেলা কৌশল হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা
নিম্নে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কয়েকটি প্রামাণ্য সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো।
Jemes L. Jundy এর মতে ''দুর্যোগ্য ব্যবস্থাপনা হলো দূর্যোগ নিবরণ, দূর্যোগের প্রস্তুতি, মোকাবেলা এবং দূর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাঠিয়ে উঠার জন্য পরিকল্পিত উপায়।''
Wikipedia তে বলা হয়েছে, ''দুর্যোগের প্রভাব কমানোর জন্য জরুরি মুহূর্তে প্রস্তুতি, প্রতিক্রিয়া পুনরুদ্ধারে সকল মানবিক দিকগুলি মোকাবেলা করার জন্য সম্পদ ও দায়িত্ব একত্রিকরণ ও ব্যবস্থাপনা করাকে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বলা হয়।''
দূর্যোগ সম্পর্কে বলা হয়েছে- ''দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের লক্ষ্যে দূর্যোগপূর্ব, দূর্যোগকালীন ও দূর্যোগপরবর্তী যাবতীয় কার্যক্রমের বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন পর্যন্ত সকল কর্মকান্ড সম্পাদন করাকে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বলা হয়।''
Dr. Kshanda Mohan Das এর মতে ''Disaster managment is a body of policy and administrative decision and operational activities which pertain to the various stages of disaster (pre, during and post) and of all levels.''
সুতরাং বলা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা হলো এক ধরনের প্রক্রিয়া বা চলমান কার্যক্রম যা দূর্যোগ সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনা করে।আর এর মাধ্যমে দূর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা ও পুনর্বাসন করার চেষ্টা করা হয়।
দুর্যোগের শ্রেণিবিন্যাস (ধরন):
দুর্যোগ প্রধানত দুই ধরনের: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ।
১. প্রাকৃতিক দুর্যোগ:
প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমন প্রাকৃতিক ঘটনা বা প্রক্রিয়া যা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং মানুষের জন্য বিপদ বা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এগুলি সাধারণত পৃথিবীর প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ঘটে এবং মানুষ একে নিয়ন্ত্রণ করতে বা প্রতিরোধ করতে পারে না। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো:
(ক) বন্যা:
বন্যা হলো যখন নদী, সমুদ্র বা অন্য কোনো জলাশয়ের পানি স্বাভাবিক স্তরের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে যায় এবং তার ফলে আশপাশের এলাকায় পানির উচ্চতা বেড়ে গিয়ে ক্ষতি সাধিত হয়। বন্যা নানা কারণে ঘটতে পারে, যেমন অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, নদীর অববাহিকায় ভূমি ভরাট হওয়া, ড্যাম বা বাঁধ ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি।
(খ) ঘূর্ণিঝড় (Cyclone):
ঘূর্ণিঝড় হলো শক্তিশালী, গোলাকার আকারের ঝড় যা সাধারণত মহাসাগর বা সমুদ্রের ওপর সৃষ্টি হয়। এটি প্রচণ্ড বাতাস ও বৃষ্টির সাথে যুক্ত থাকে এবং উপকূলীয় এলাকা, মেঘালয়, ভারতীয় উপমহাদেশ, এবং অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলগুলির জন্য মারাত্মক বিপদ সৃষ্টি করে।
(গ) ভূমিকম্প (Earthquake):
ভূমিকম্প হলো পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রচণ্ড শক্তি মুক্তির ফলে পৃথিবীর পৃষ্ঠে সংঘটিত কম্পন বা কম্পনাগ্রস্ত অবস্থা। এটি সুনামি, ভূমিধস, ভবন ধস ইত্যাদির কারণ হতে পারে এবং মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য ব্যাপক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
(ঘ) খরা (Drought):
খরা হলো দীর্ঘকাল ধরে বৃষ্টিপাতের অভাব, যা পানির ঘাটতি সৃষ্টি করে এবং কৃষি, পানীয় জল সরবরাহ এবং পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়। এটি খাদ্য সংকট, নদী বা জলাশয়ের পানি শুকিয়ে যাওয়া, এবং প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার সমস্যার সৃষ্টি করে।
(ঙ) ভূমিধস (Landslide):
ভূমিধস হলো ভূমির গতি পরিবর্তন হয়ে পাহাড় বা ঢালু অঞ্চলে মাটি বা পাথরের বড় অংশ নিচে নেমে আসা। এটি সাধারণত অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বা ভূমিকম্পের কারণে ঘটতে পারে। ভূমিধস এলাকার অধিবাসীদের জন্য বিপজ্জনক এবং এটি যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কৃষি জমির ক্ষতি করতে পারে।
২. মানবসৃষ্ট দুর্যোগ:
মানবসৃষ্ট দুর্যোগ এমন ঘটনা বা বিপর্যয় যা মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে ঘটে এবং মানুষের জীবন, পরিবেশ ও সম্পদে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। এসব দুর্যোগে মানুষের সরাসরি ভূমিকা থাকে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সচেতনতা ও সাবধানতা অবলম্বন করলে এর প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে। মানবসৃষ্ট দুর্যোগের মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো:
(ক) অগ্নিকাণ্ড (Fire Disaster):
অগ্নিকাণ্ড হলো যখন কোনো স্থানে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অগ্নিকাণ্ডের প্রধান কারণ হতে পারে বিদ্যুতের ত্রুটি, গ্যাস লিকেজ, বনায়ন ও বনভূমিতে আগুন লাগা, ইত্যাদি। এটি জীবন এবং সম্পত্তির ক্ষতি করতে পারে।
(খ) রাসায়নিক বিস্ফোরণ (Chemical Explosion):
রাসায়নিক বিস্ফোরণ ঘটতে পারে যখন কোন রাসায়নিক পদার্থ অপসৃত হয় এবং এতে বিস্ফোরণ ঘটে। এটি শিল্পাঞ্চল, কেমিক্যাল কারখানা বা পরিবহণের সময় ঘটতে পারে। এর ফলে তীব্র আগুন, বিষাক্ত গ্যাসের নিঃসরণ এবং বিস্ফোরণের ফলে ব্যাপক ধ্বংস হয়।
(গ) যুদ্ধ (War):
যুদ্ধ হলো একটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ যেখানে এক বা একাধিক দেশ বা গোষ্ঠী একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধের ফলে ব্যাপক প্রাণহানি, সম্পত্তির ক্ষতি, পরিবেশের ক্ষতি এবং শরণার্থী সংকট সৃষ্টি হতে পারে। এটি সাধারণত রাজনৈতিক বা জাতিগত দ্বন্দ্বের কারণে ঘটে।
(ঘ) পরিবেশ দূষণ (Environmental Pollution):
পরিবেশ দূষণ এমন একটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ যা মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ঘটে এবং এতে প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। এটির মধ্যে রয়েছে বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, মাটি দূষণ, শব্দ দূষণ, প্লাস্টিক দূষণ ইত্যাদি। পরিবেশ দূষণ জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক বিপদ সৃষ্টি করতে পারে।
(ঙ) পারমাণবিক দুর্ঘটনা (Nuclear Disaster):
পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটে যখন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা কোনো পারমাণবিক রিয়্যাক্টরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি ঘটে এবং তার ফলে বিকিরণ ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে আশপাশের এলাকায় ব্যাপক পরিবেশগত ক্ষতি এবং মানুষের জীবন হুমকির মধ্যে পড়ে।
(চ) পরিবহন দুর্ঘটনা (Transportation Disaster):
পরিবহন দুর্ঘটনা যেমন বিমান দুর্ঘটনা, ট্রেন দুর্ঘটনা, নৌকা ডুবি ইত্যাদি মানবসৃষ্ট দুর্যোগের মধ্যে পড়তে পারে। এটি মানুষের জীবন ও সম্পত্তির জন্য ক্ষতিকর এবং মাঝে মাঝে বড় ধরনের সামাজিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারের ভূমিকা:
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর (DDM) গঠন
ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ
আগাম বার্তা প্রচার ব্যবস্থা (SMS, রেডিও, টিভি)
ত্রাণ তহবিল বরাদ্দ
সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের সমন্বিত উদ্যোগ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এনজিও ও জনগণের ভূমিকা:
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন এনজিও ও সিভিল সোসাইটির বড় ভূমিকা পালন করে। যেমন- ব্র্যাক, রেড ক্রিসেন্ট, ঘাসফুল, ওয়ার্ল্ড ভিশন প্রভৃতি এনজিও ত্রাণ, পুনর্বাসন ও সচেতনতামূলক কাজ করে।
পরিশেষে বলা যায় যে, দুর্যোগ এক প্রকার ক্ষতিকর নেতিবাচক মারাত্মক পরিস্থিতি যা মানবজীবনে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করে মানবজীবনকে দূর্বিসহ করে তোলে। দুর্যোগ ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বা ক্ষতিকর পরিস্থিতি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

Comments
Post a Comment