টেকসই উন্নয়ন সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল লিখ
ভূমিকা:- একাবিংশ শতাব্দির শুরু এবং বিংশ শতাব্দির শেষার্ধের একটি বহুল ব্যবহৃত প্রত্যয় হলো টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development)। টেকসই উন্নয়ন এমন একটি সাংগঠনিক নীতি যার উদ্দেশ্য হলো মানব উন্নয়নের লক্ষ পূরণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে সহনশীল রেখে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বাস্তবিক সেবা প্রদান করা। ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘের 'ওয়ার্ল্ড কমিশন অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট' (WCED) তাদের 'আওয়ার কমন ফিউচার' (Our Common Future) বা ব্রুন্ডল্যান্ড রিপোর্টে বলেন- টেকসই উন্নয়ন মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। যথা-অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক সাম্য, পরিবেশ সংরক্ষণ। আজকে আমরা টেকসই উন্নয় কী এবং তার বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল নিয়ে আলোচনা করব।
টেকসই উন্নয়ন ধারণাটির বিকাশ ঘটে ১৯৭০ দশকে। সে সময় পরিবেশ ইস্যু নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং পরিবেশকে উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে গ্রহণ করে টেকসই উন্নয়নের ধারণাটি বিবেচনায় আনা হয়।
উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সাথে টেকসই ধারণাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিশেষ করে পরিবেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়ন ধারণাটির কার্যকারিতা অপরিসীম।
টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development):
টেকসই উন্নয়ন ধারণাটি মূলত উন্নয়ন ধারণা থেকেই উৎপত্তি লাভ করে। টেকসই উন্নয়ন দ্বারা মুলত কোন বিশেষ উন্নয়নকে বোঝায় না বরং উন্নয়নকে স্থায়ী করা বোঝায় ।
আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিবেশগত বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে উন্নয়ন সংঘটিত হয়। সমাজবিজ্ঞানের অধ্যয়নে Development বা উন্নয়ন হলো একটি কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়। এখানে উন্নয়ন বলতে সাধারণভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বোঝায়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংঘঠিত হয় দেশের অভ্যন্তরের উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে সমাজকাঠামো ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ নবরূপে আবির্ভুত হয় ও জটিল রূপ ধারণ করে। টেকসই উন্নয়ন হলো বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে ভবিষ্যৎ এর জন্য পরিবেশ রক্ষা করাকে বুঝায়।
অন্যভাবে টেকসই উন্নয়নকে বলা যায় যে, টেকসই উন্নয়ন বলতে বুঝায় পৃথিবীর সম্পদ এমনভাবে ব্যবহার করা যাতে কেবল মাত্র বর্তমান প্রজন্ম তা ভোগ না করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ও তা সংরক্ষণ করে।
সমাজবিজ্ঞানে টেকসই উন্নয়নকে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।যদিও Sustainable Development শব্দটির শাব্দিক অর্থ টেকসই উন্নয়ন বা স্থিতিশীল উন্নয়ন। যে উন্নয়ন প্রক্রিয়া একদিক বিবেচনায় উন্নত অন্যদিকে বিবেচনায় অনুন্নত সে উন্নয়নের স্থিতিশীলতা থাকেনা। তাই যে উন্নয়ন প্রক্রিয়া সবদিক বিবেচনায় মঙ্গলজনক, পরিবেশের সহায়ক উন্নয়নকে টেকসই উন্নয়ন বলে বিবেচনা করা হয়।
টেকসই উন্নয়নের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা।
২. প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার।
৩. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও উন্নয়ন।
৪. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করা।
৫. অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত দিক একত্রে বিবেচনা।
৬. দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক বৈষম্য হ্রাস।
৭. জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ।
টেকসই উন্নয়নের গুরুত্ব বা ফলাফল:
১. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদের নিশ্চয়তা প্রদান করে।
২. পরিবেশ দূষণ ও বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে সহায়তা করে।
৩. সম্পদ অপচয় রোধ হয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
৪. অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন একসঙ্গে ঘটে।
৫. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান গড়ে ওঠে।
৬. দারিদ্র্য হ্রাস ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, টেকসই উন্নয়ন কোনো একক দেশের বিষয় নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক অঙ্গীকার। টেকসই উন্নয়ন একটি আধুনিক, সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় ধারণা।আজকের বিশ্বে পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও দারিদ্র্য সমস্যার সমাধান করতে হলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
