অপরাধ কি? অপরাধের কারণসমূহ আলোচনা কর
ভূমিকা:- আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে করে দিয়েছে অনেক সহজতর। এর সাথে সাথে আমাদেরকেও দিয়েছে নানা ধরনের জটিল সমস্যা। এসব সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো অপরাধ প্রবণতা। মানুষের অবাঞ্ছিত আচরণই অপরাধ। বাংলাদেশের বড় বড় শহরগুলিতে অপরাধের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে যা নগরের জনগণকে অতিষ্ঠ করছে।
অপরাধের সংজ্ঞা
অপরাধ হলো এমন এক ধরনের সমাজবিরোধী আচরণ বা কাজ যা জনসাধারণের স্বাভাবিক অনুভূতির বিরুদ্ধে কাজ করে ও দেশের আইনে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়ে থাকে।
সমাজবিজ্ঞানী স্টেফেন এর মতে ''অপরাধ হলো সেই সকল কাজ যা করা বা না করর জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।''
অধ্যাপক এফ আর খানের মতে ''যেসব আচরণ সমাজ ও নৈতিকতা বিরোধী তাকে অপরাধ বলে।''
স্টিফেন বলেছেন অপরাধ হলো সেই সব কাজ বা আচরণ না করা যার জন্য আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে।''
Readcliffe Brown এর মতে ''যে প্রচলিত রীতিনীতি ভঙ্গ করলে শাস্তির ব্যবস্থা আছে তাই অপরাধ।''
পরিশেষে বলা যায় যে সকল কাজ সমাজের চোখে অন্যায় এবং আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য সে সকল কাজই অপরাধ।
অপরাধের কারণসমূহ:-
অপরাধের পেছনে বহুবিধ কারণ বিদ্যমান রয়েছে। দেশ, কাল, পাত্র ভেদে এসব কারণ ভিন্ন হতে পারে। নিম্নে কয়েকটি কারণ আলোচনা করা হলো।
১। মূল্যবোধের অবক্ষয়
অপরাধ সংঘঠিত হওয়ার অন্যতম কারণ হলো সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।দিন দিন আমাদের মূল্যবোধগুলি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যার কারণে অপরাধের সংখ্যাও বাড়ছে।
২। ধর্মীয় ভাবাবেগ
অপরাধের আর একটি অন্যতম কারন হলো ধর্ম। কেননা অনেকেই ধর্মকে ব্যবহার করে অপরাধ সংঘঠিত করে। এর মধ্যে অন্যতম উদাহরণ হলো বাংলা ভাই।
৩। অনুন্নত শিক্ষাব্যবস্থা
উন্নত আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষাব্যবস্থার বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের চরিত্র গঠনে আমাদের শিক্ষা তেমন অবদান রাখতে পারছেনা।ফলে মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় শিক্ষার অভাব দেখা যাচ্ছে । যার কারণে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৪। দারিদ্র্য
অপরাধ প্রবণতার অন্যতম কারণ হলো দারিদ্র্যতা। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ ফলে, এ দেশের অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। আর এই দারিদ্র্যতার জন্য তারা চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির মত অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
৫। শিল্পায়ন
অপরাধের আর একটি কারণ হলো শিল্পায়ন। শিল্পায়নের ফলে মানুষ শহরে এসে কল-কারখানায় কাজ করে অল্প বেতন পায় যাতে তার মাসব্যাপী চলতে অসুবিধা হয় তখন সে চুরি, ছিনতাইয়ের অপরাধে যুক্ত হয়ে যায়।
৬। বেকারত্ব:
চাকরি বা কর্মসংস্থানের অভাবে যুবসমাজ হতাশ হয়ে অপরাধে জড়ায়। কাজ না পেলে তারা অবৈধ পথে উপার্জনের চেষ্টা করে।
৭। মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব:
মিডিয়া সমাজের একটি শক্তিশালী উপকরণ, যা মানুষের চিন্তা-ভাবনা, আচরণ এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে, যখন মিডিয়া অপরাধ এবং সহিংসতার মতো নেতিবাচক বিষয়কে হালকাভাবে উপস্থাপন করে বা অতিরঞ্জিতভাবে glorify করে, তখন এর প্রভাব সমাজের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। টেলিভিশন শো, সিনেমা, সোশ্যাল মিডিয়া, এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অপরাধকে আকর্ষণীয় এবং মাঝে মাঝে "হিরোইক"ভাবে তুলে ধরতে পারে, যা মানুষকে ভুল বার্তা দেয় এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে।
৮। পারিবারিক অবহেলা ও ভাঙন:
পারিবারিক দারিদ্র্য, মা-বাবার বিচ্ছেদ, অসুখী দাম্পত্য জীবন ইত্যাদি কিশোর-তরুণদের মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে এবং তারা অপরাধী হয়ে ওঠে।
৯। মাদকের সহজলভ্যতা:
মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা এবং এর প্রতি সহজ প্রবেশাধিকার একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে। মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ সহজেই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে এবং অপরাধ করে টাকা জোগাড় করে।
১০। দুর্বল আইন ও বিচারব্যবস্থা:
অপরাধ করে অনেকেই শাস্তি পায় না। দেশের আইন এবং বিচারব্যবস্থা যদি কার্যকর না হয়, তবে অপরাধীরা তাদের অপরাধ করতে উৎসাহিত হয়। অপরাধীরা জানে যে তারা শাস্তি পাবে না, বা শাস্তি দীর্ঘসময় পরে কার্যকর হবে, তাই তারা একের পর এক অপরাধ করে চলে।
১১। সামাজিক বৈষম্য:
সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক অসমতা, এবং সামাজিক শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য অপরাধের মূল কারণ হতে পারে। যখন কিছু মানুষ অভিজ্ঞান ও সম্পদে ধনী হয় এবং অন্যরা দারিদ্র্য ও দুর্দশায় পড়ে থাকে, তখন হতাশা এবং ক্ষোভ থেকে অপরাধের জন্ম নিতে পারে। সমাজের অন্নসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সুযোগের অসমতা মানুষের মধ্যে অবিচার অনুভূতি তৈরি করতে পারে, যার ফলে অপরাধ বৃদ্ধি পায়।
১২। মানসিক অসুস্থতা:
বিভিন্ন মানসিক অসুস্থতা যেমন- অ্যাংজাইটি, বিষণ্নতা, বা অন্য মানসিক সমস্যা, অনেক সময় অপরাধমূলক আচরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের মানুষ নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাদের মানসিক অবস্থা তাদের চিন্তা-ভাবনাকে বিকৃত করে এবং অপরাধমূলক কাজের দিকে ঠেলে দেয়।
১৩। সংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রভাব:
যে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বেশি, সেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অপরাধকে সাধারণ বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখে। এই পরিবেশ তাদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি অপরাধের কারণ হতে পারে, বিশেষত যখন তা একটি সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
১৪। সাংস্কৃতিক অবক্ষয়:
যখন একটি সমাজের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও রীতি-নীতি ভেঙে পড়ে, তখন সে সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি পায়। অপরাধ একটি সামাজিক রোগ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি নতুন প্রজন্মের মধ্যে বংশানুক্রমিকভাবে পা ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, যখন পারিবারিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
১৫। শক্তিশালী নৈতিক শিক্ষার অভাব:
আজকাল অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিষয়ে শিক্ষাদান যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রথাগত নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শেখে না, যা তাদের জীবনের সব ক্ষেত্রেই অপরাধমুক্ত মনোভাব গঠনে সহায়তা করবে। নৈতিক শিক্ষা না থাকার কারণে যুবসমাজ অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
১৬। প্রযুক্তির অপব্যবহার:
আজকাল প্রযুক্তি যেমন- ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার অপরাধের জন্য একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকারি, এবং গোপনীয়তার লঙ্ঘন এসব অপরাধের মধ্যে পড়ে। এই প্রযুক্তির সহজলভ্যতা অপরাধীদের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
১৭। অপরাধীদের পুনর্বাসন অভাব:
অপরাধীদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকলে, তারা আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কারাগারে বা সংশোধনাগারে আটক থাকার পরও অপরাধীদের সমাজে পুনঃপ্রবেশ করার পর কোনো ধরনের সহায়তা না পাওয়ার কারণে তারা আগের অপরাধের পথে ফিরে যেতে পারে।
১৮। পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অদক্ষতা:
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অদক্ষতা এবং দুর্নীতি অপরাধের বিস্তার ঘটাতে সাহায্য করে। যখন অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি দেওয়া হয় না, তখন তারা অপরাধে উৎসাহিত হয় এবং অপরাধ আরও বেড়ে যায়। পুলিশ বাহিনীর দুর্বলতা ও জনগণের প্রতি অপর্যাপ্ত সেবা সমাজে অপরাধ বাড়ানোর অন্যতম কারণ।
১৯। অনুপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা:
যখন অপরাধীদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা যথাযথ বা সময়োপযোগী হয় না, তখন অপরাধীরা তা উপেক্ষা করে আবারও অপরাধ করার সাহস পায়। শাস্তি যদি যথাযথ না হয়, তবে এটি অপরাধীদের জন্য একটি ইঙ্গিত হয়ে দাঁড়ায় যে, তারা শাস্তি ছাড়াই অপরাধ করতে পারে।
২০। স্বার্থপরতা ও ব্যক্তিত্বের সংকট:
অনেক সময় ব্যক্তি তাদের নিজস্ব স্বার্থের জন্য অন্যের ক্ষতি করতে পারে। একজন অপরাধী যখন নিজের লাভ বা সুবিধা অর্জনের জন্য অন্যদের ক্ষতি করতে সক্ষম হয়, তখন সে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ব্যক্তিত্বের সংকট, যেমন, অহংকার বা গরিব-ধনী পার্থক্য, অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে তোলে।
বাংলাদেশের অপরাধ সংঘঠিত হওয়ার জন্য অনেক কারণ বিদ্যমান রয়েছে। তাই আমাদের উচিত অপরাধ কমানোর জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
