মাদকাসক্তির সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা
ভূমিকা:- মাদকাসক্তি পৃথিবীর জন্য ভয়ংকর সামাজিক সমস্যা। এর প্রভাবে ব্যক্তি থেকে শুরু করে দেশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।মাদকদ্রব্য বন্ধ করতে না পারলে একসময়ে সমাজব্যবস্তা অচল হয়ে পড়বে।বিশ্ব আজ মাদকাসক্তির ক্রমবিস্তারে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করার জন্য জাতিসংঘ ১৬ই জুন কে আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
মাদকাসক্তির সংজ্ঞা
মাদকাসক্তির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Drug Addiction। Drug বলতে বুঝায় কোন রাসায়নিক দ্রব্যকে আর Addiction বলতে আসক্তিকে। সুতরাং বলা যায় জীবদেহে রাসায়নিক দ্রব্য গ্রহণে আসক্ত হওয়াকে মাদকাসক্তি বলে।
মাদকাসক্তি এক প্রকার আত্মবিনাশকারী নেশা।এর প্রভাবে ব্যক্তির আচার-আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেই।প্রথম দিকে সেবনকারী দেহ ও মনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেই।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা
বিশ্ব সংস্থার মতে, ''মাদকাসক্তি হলো মানসিক বা শারীরিক প্রতিক্রয়া, যা জীবিত প্রাণী ও মাদকের মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়ার উল্লেখ যোগ্য লক্ষণ গুলো হচ্ছে মাদকদ্রব্যটি কমবেশি নিয়মিত গ্রহণের দুর্দমনীয় ইচ্ছা, মাদকদ্রব্য সৃষ্টির ফল বা প্রতিক্রিয়া পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা অথবা মাদকদ্রব্য না থাকার অস্বস্তি এড়ানোর প্রচেষ্টা''
According to 'Social work Dictionary' 'Addicction is physiological and psychological dependence on a chemical that results is incresed tolerance and in withdrawal symptoms when the substance is unavilable.'
উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে মাদকদ্রব্য গুলো হলো গাঁজা, আফিম, রেস, ভাং, মদ, মরফিন,হাসিস, কোকেন, হেরোইন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
মাদকাসক্তির বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা
নিম্নে মাদকাসক্তির বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করা হলো-
১. তীব্র ও অনিয়ন্ত্রিত আকাঙ্ক্ষা (Compulsion)
মাদকাসক্ত ব্যক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো যেকোনো মূল্যে মাদক সংগ্রহ করার প্রচণ্ড ইচ্ছা। এই আকাঙ্ক্ষা এতই তীব্র হয় যে, ব্যক্তি নিজের ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। অনেক সময় নিজের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করে।
২. সহনশীলতা ও মাত্রা বৃদ্ধি (Tolerance)
মাদকদ্রব্য গ্রহণের মাত্রা সময়ের সাথে সাথে ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। শুরুতে অল্প মাত্রায় নেশা হলেও পরবর্তীতে শরীরের সহনশীলতা বেড়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত আমেজ পেতে আসক্ত ব্যক্তি অধিক পরিমাণে মাদক গ্রহণ করতে থাকে।
৩. শারীরিক ও মানসিক নির্ভরশীলতা (Dependence)
মাদকের ক্রিয়ার ওপর ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক নির্ভরশীলতা তৈরি হয়। মাদক ছাড়া শরীর অচল মনে হওয়া এবং মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়া মাদকাসক্তির অন্যতম লক্ষণ।
৪. কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রভাব
মাদক মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (Central Nervous System) এবং বাস্তব কর্মকাণ্ডের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। এতে ব্যক্তির চিন্তা শক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা লোপ পায়।
৫. কর্মক্ষমতা হ্রাস ও আত্মবিধ্বংসী আচরণ
মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক কর্মক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ব্যক্তি আত্মবিধ্বংসী কাজ বা আত্মহত্যার পথও বেছে নিতে পারে।
৬. অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক অবক্ষয়
মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতে আসক্ত ব্যক্তি চুরি, ছিনতাই, হত্যা ও প্রতারণার মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়।
৭. পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
মাদকাসক্ত ব্যক্তির কারণে পরিবারে কলহ, বিচ্ছেদ ও নির্যাতন বৃদ্ধি পায়। মাদক কেনার জন্য নিজের ও পরিবারের সম্পদ বিক্রি করে দেওয়ায় পরিবারে চরম দারিদ্র্য নেমে আসে।
৮. জীবননাশের ঝুঁকি (Overdose)
অতিরিক্ত মাদক গ্রহণের ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে এবং ওভারডোজের (Overdose) কারণে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় মাদকাসক্তি হলো এমন একটি স্নায়বিক অবস্থা যার ফলে কোন ব্যক্তি রাসায়নিক উপাদানের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং নেশার প্রভাবে তার মানবৈকল্য ঘটায়। মাদকের নেশা মানুষকে নৈতিক, মানসিক ও শারীরিকভাবে ধ্বংস করে দেয়। এটি প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে একযোগে সচেতন ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এখনই সময় মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার।
