সম্পত্তির সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর
ভূমিকা:- বেঁচে থাকা মানুষের চিরন্তর প্রত্যাশা। তাই বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষ প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলেছে।আদিমকালে মানুষ যখন বনে জঙ্গলে, গুহায় বসবাস করতো তখন থেকেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে তাদের আমরণ সংগ্রাম করতে হয়েছে। জীবনধারনের জন্য সম্পত্তির গুরুত্ব অপরিসীম। কোন কিছুর উপর ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ মালিকানা বা অধিকারকে সম্পত্তি বলে।
সম্পত্তির সংজ্ঞা
সাধারণ অর্থে সম্পত্তি হলো কোন বস্তু সম্পদের ওপর ব্যক্তির সমাজস্বীকৃত চূড়ান্ত মালিকানা। অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও উপযোগসম্বলিত মালিকানাধীন কোন বস্তুকে সম্পত্তি বলা যেতে পারে।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা
বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবীদ সম্পত্তিকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন তাদের কয়েবটি সংজ্ঞা নিম্নরুপ-
কিংসলে ডেভিস (K. Davis) তার গ্রন্থে বলেন- “সম্পত্তি সীমাবদ্ধ কোন কিছুতে মানুষের অধিকার এবং আইনগত বৈধতা ব্যতীত আর কিছুই নয়।”
জন লক এর মতে- “মানুষ নিজ দেহের শ্রম এবং কাজের দ্বারা যে সকল প্রয়োজনীয় বস্তু সংগ্রহ করে তাই ব্যক্তির সম্পত্তি।”
এল. টি. হবহাউস (L. T. Hobhouse) এর মতে- “সম্পত্তি এমন একটি প্রত্যয়কে ধারণ করে, যা বস্তুর উপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ। এ নিয়ন্ত্রণ সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত এবং সম্পত্তি কমবেশি স্থায়ী ও একচেটিয়া।”
উইলিয়াম পি. স্কট এর মতে সম্পত্তি হলো কোনো সম্পদ বা কাজের সাথে সম্পর্কযুক্ত এমন সব অধিকার, সুযোগ সুবিধা এবং দায়িত্ব যা সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত।”
এডাম স্মিথ এর মতে-“ব্যক্তির এখতিয়ার ভূক্ত সব কিছুই তার সম্পত্তি।”
অগন্ডারসন ও পার্কার এর মতে-“সম্পত্তি বলতে বোঝায় দ্রব্যসামগ্রী ও সেবাসমূহের মালিকানা যার ভোগ,অধিকার বা সংরক্ষণের মালিকানা সমাজ কর্তৃক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দেওয়া হয়।”
আধুনিক চিন্তাবিদগণ মনে করেন যে-“মানুষ তার সৃজনশীল ক্ষমতার মাধ্যমে বা উত্তরাধিকার সূত্রে কোন কিছু অর্জন করে সমাজে এবং তার অধিকার ও কর্তব্য প্রতিষ্ঠা করে থাকে। সেই অধিকার ও কর্তব্যর আধারকেই সম্পত্তি বলে।”
সুতরাং সম্পত্তি হলো এমন এক ধরনের সম্পদ যার উপর ব্যক্তি বা সমাজের নিরঙ্কুশ এবং স্থায়ী মালিকানা ও অধিকার রয়েছে।
সম্পত্তির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. উপযোগিতা (Utility)
সম্পত্তির প্রথম এবং প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর উপযোগিতা থাকতে হবে। অর্থাৎ, বস্তুটি মানুষের কোনো না কোনো অভাব পূরণ করতে সক্ষম হতে হবে। উপযোগহীন কোনো বস্তু সাধারণত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয় না।
২. হস্তান্তরযোগ্যতা (Transferability)
সম্পত্তি অবশ্যই এক হাত থেকে অন্য হাতে বা এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরযোগ্য হতে হবে। যে জিনিসের মালিকানা পরিবর্তন করা যায় না (যেমন: মানুষের মেধা বা ব্যক্তিগত গুণাবলি), তাকে সরাসরি আইনগত অর্থে সম্পত্তি বলা কঠিন।
৩. সীমাবদ্ধতা বা দুষ্প্রাপ্যতা (Scarcity)
যেসব বস্তু প্রকৃতিতে অফুরন্ত (যেমন: খোলা বাতাস বা সূর্যের আলো), সেগুলোকে সাধারণত সম্পত্তি বলা হয় না। সম্পত্তি হতে হলে তাকে অবশ্যই চাহিদার তুলনায় সীমাবদ্ধ হতে হবে, যাতে তার একটি বাজারমূল্য থাকে।
৪. আইনগত অধিকার ও মালিকানা (Legal Ownership)
সম্পত্তির ওপর মালিকের আইনগত নিয়ন্ত্রণ থাকতে হয়। রাষ্ট্র বা আইনের স্বীকৃতি ছাড়া কোনো বস্তুর ওপর দাবিকে পূর্ণাঙ্গ সম্পত্তি বলা যায় না। মালিক চাইলে তার সম্পত্তি আইনানুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ বা ধ্বংস করতে পারেন।
৫. বিনিময় মূল্য (Exchange Value)
সম্পত্তির একটি আর্থিক বা বিনিময় মূল্য থাকতে হবে। অর্থাৎ, যা অর্থের বিনিময়ে কেনা বা বেচা যায় না, তা সম্পত্তির সংজ্ঞায় পড়ে না।
৬. স্থায়িত্ব (Durability)
সম্পত্তি সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়। যদিও কিছু ভোগ্যপণ্য দ্রুত শেষ হয়ে যায়, তবুও স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত টিকে থাকার ক্ষমতা থাকে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সম্পত্তি বলতে কোন বস্তুর ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে বুঝায়, যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত মোটামুটি স্থায়ী ও একচেটিয়া। সম্পত্তি অর্থনীতির একটি মৌলিক প্রত্যয়। সামাজিক মানুষ তথ্য সমাজের কোন সদস্য সম্পত্তি থেকে বিছিন্ন নয়।মানুষের জীবন ধারনের মতো সম্পত্তিও একটি আদিম প্রত্যয়। সম্পত্তি মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি মৌলিক ধারণা। এটি কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, বরং এটি মানুষের সামাজিক অবস্থান, দায়িত্ব ও অধিকারকেও প্রতিফলিত করে। সম্পত্তি সমাজে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও উন্নয়নের প্রতীক। অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে সম্পত্তির গুরুত্ব অপরিসীম। তাই সম্পত্তি মানুষের জীবনে আদিম এবং চিরন্তন এক প্রত্যয়। বর্তমানে সম্পত্তির উপর ভিত্তি করেও অনেক সময় সমাজ জীবনে ব্যক্তির সম্মান, ক্ষমতা,পদ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
