বাংলাদেশে নদী ভাঙনের ফলাফল আলোচনা কর

বাংলাদেশে নদী ভাঙনের ফলাফল আলোচনা কর

ভূমিকা:- বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ এবং এ দেশে নদী ভাঙন একটি নিয়মিত ও চলমান প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতি বছর দেশের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নদী ভাঙনের কবলে পড়ে তাদের সহায়-সম্বল ও ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। নদী ভাঙন কেবল জমি কেড়ে নেয় না, বরং এটি একটি সাজানো পরিবারকে মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নমূল করে দেয়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আজকের ব্লগে আমরা বাংলাদেশে নদী ভাঙনের বহুমুখী ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব

বাংলাদেশে নদী ভাঙনের ফলাফল

বাংলাদেশে নদী ভাঙনের ফলাফল বা ক্ষতিসমূহ

বাংলাদেশে নদী ভাঙন অভিশাপস্বরূপ। এই নদী ভাঙনের ফলে এদেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি লক্ষ্য করা যায়। নিম্নে নদী ভাঙনের ফলে সৃষ্ট ক্ষতিসমূহের ফলাফল আলোচনা করা হলো।

১। দারিদ্র্য বৃদ্ধি

বর্তমানে নদী ভাঙনের ফলে নদী এলাকার লোকজনের দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পায়। কারণ, দারিদ্র্যের শর্তই হলো সম্পদ ধ্বংস। আর নদী ভাঙনের ফলে তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে গিয়ে তারা সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। ফলে তারা হতদরিদ্র হয়ে পড়ে।

২। উদ্বাস্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি

বর্তমানে বাংলাদেশের উদ্বাস্তুর প্রধান কারণ হলো নদী ভাঙন বৃদ্ধি।নদী ভাঙনের ফলে মানুষ অনেক সময় শহরে স্থানান্তরিত হয়। এতে শহরে উদ্বাস্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। সমাজজীবনের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।

৩। উৎপাদন হ্রাস

নদী ভাঙনের ফলে উৎপাদন হ্রাস পায়।কারণ নদী ভাঙনের ফলে ফসলের জমিসহ সকল ধরনের জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তাই উৎপাদন কমে যায় ।

৪। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি

নদী ভাঙনের ফলে দ্রবমূল্য বৃদ্ধি পায়।কারণ নদী ভাঙনের ফলে ঐ এলাকায় কোন পণ্য উৎপাদিত হয় না যার ফলে চাহিদা বেড়ে গিয়ে দ্রব্য মূল্য বেড়ে যায়।

৫। অপরাধ বৃদ্ধি

বর্তমানে যে সকল অঞ্চলে নদী ভাঙন দেখা যায় সে সকল অঞ্চলে অপরাধও বেড়ে যায়। অপরাধ বিজ্ঞানী লম্ভসেন এর মতে যে চর অঞ্চলের লোকেরা সাধারণত কলহে বেশি লিপ্ত থাকে সে কারণে সেখানে অপরাধের মাত্রা ও বেশি থাকে।

৬। রোগব্যাধির বিস্তার

যে অঞ্চলে নদী ভাঙন দেখা যায় সে অঞ্চলে রোগব্যাধির পরিমাণ ও বেশি দেখা যায়। কারণ নদী ভাঙনের ফলে কলেরা, ডায়রিয়া, টাইফয়েড ইত্যাদি রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হলে মানুষ কাজকর্ম করার শক্তি হারিয়ে ফেলে।

৭। শহরে জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি

যদি কোন অঞ্চলে নদী ভাঙন হয় তবে সে অঞ্চলে জনসংখ্যার চাপ কমে যায়। কারণ তারা চরম দারিদ্র্যের সাথে দিন কাটায়। তখন তারা শহরের দিকে স্থানান্তরিত হতে থাকে ফলে শহরে জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পায়।

৮। পুষ্টিহীনতা

নদী ভাঙন এলাকায় পুষ্টিহীনতা দেখা যায়। কারণ সেখানকার লোকেরা তখন অপর্যাপ্ত খাবার ও অসুস্থতার কারণে পুষ্টিহীনতায় ভোগে যা তাদের জন্য মারাত্মক সমস্যা।

৯। সম্পদহানী

নদী ভাঙনের ফলে সম্পদের হ্রাস পায়। কারণ একজন মানুষের যদি ১০ বিঘা জমি থাকে তবে তা নদী ভাঙনের ফলে একেবারে নিঃশেষ বা কমে যেতে পারে। তার ফলে মানুষ তখন আরো দরিদ্র্য হয়ে যায়।

১০। শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাঘাত

নদী ভাঙনের ফলে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়। শিক্ষার্থীরা স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়, ফলে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

১১। সামাজিক অস্থিরতা

বাসস্থান হারানোর কারণে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে সমাজে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।

১২। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি

ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারানোর কারণে মানুষ হতাশা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের মধ্যে ভোগে।

১৩। অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি

রাস্তা, বাঁধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাজার নদী ভাঙনের ফলে ধ্বংস হয়ে যায়, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে ব্যাহত করে।

পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের জন্য নদী ভাঙন একটি অভিশাপ। শহরাঞ্চলে অনেক দীনমজুর আছেন যারা নদী ভাঙনের ফলে এই শহরে এসে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাই নদী ভাঙন রোধে সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণ অতি জরুরি তা না হলে এক সময়ে অর্ধেক দেশ নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন