দুর্যোগ কী? দূর্যোগ সৃষ্টির কারণসমূহ আলোচনা
ভূমিকা:- মানুষ তাঁর পারিপার্শ্বিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গ্রহ-গ্রহান্তরে পাড়ি জমানোর চেষ্টায় বিভোর। কখনো কখনও মানুষ তার চলার পথে সম্মুখীন হয়েছে বাধা-বিপত্তির। এসব বাধা-বিপত্তি মানুষকে করে ছন্দহীন, অসহায় ও সম্বলহীন। আর মানুষের জীবনেরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়াকে বলা হয় দুর্যোগ।
দুর্যোগের সংজ্ঞা
দুর্যোগে ইংরেজি প্রতিশব্দ Disastre যেটি ফরাসি শব্দ Disaster থেকে আগত। আবার অনেকেই মনে করেন শব্দটি ইতালিয়ান শব্দ Disastro থেকে বা গ্রিক শব্দ Dis ও aster শব্দের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। Dis শব্দের অর্থ খারাপ বা মন্দ এবং aster শব্দের অর্থ তারা। গ্রিকরা মনে করতো আকাশের কোন তারা খারাপ অবস্থানে থাকলে খারাপ ঘটনা ঘটবে। শব্দের বুৎপত্তিগতভাবে দুর্যোগ বলতে বোঝায় এমন অবস্থাকে যা মানুষকে মন্দ বা অকল্যাণকর পরিস্থিতির সম্মুখীন করে।
সাধারণভাবে দুর্যোগ বলতে বোঝায় মানুষের জীবন, সমাজ ও পরিবেশে সৃষ্ট কিছু অস্বাভাবিক অবস্থাকে যা মানুষের ক্ষতি সাধন করে থাকে। বিশেষভাবে বলা যায় যে, দুর্যোগ হলো মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাপন প্রণালিকে ব্যাহতকারী অনাকাঙ্খিত চরম দূর্ভোগ পরিস্থিতি যার মোকাবেলা করা খুবই কষ্টকর বিষয়।
বাংলাদেশে দুর্যোগ সৃষ্টির কয়েকটি কারণ
নিম্নে বাংলাদেশে দুর্যোগ সৃষ্টির কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হলো।
১। জনসংখ্যা সমস্যা
জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সম্পদের ঘাটতি, দারিদ্রতা বৃদ্ধি, অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি, দুর্নীতিসহ পরিবেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। যাতে মানুষই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
২। পানি দূষণ ও সংকট
পানি সরবরাহের ঘাটতি, অপরিকল্পিত ব্যবহার এবং বণ্টন ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে পানির দূষণ বেড়ে চলেছে। এর ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং পরিবেশগত বিপর্যয় আরও তীব্রতর হচ্ছে।
৩। বায়ু দুষণ
অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, দ্রুত নগরায়ন ও যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বায়ু মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এই দূষিত বায়ু পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
৪। মাটি দূষণ
ফসলের জমিতে বিভিন্ন কীটনাশকের ব্যবহার ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে ভূমির প্রকৃতি নষ্ট হচ্ছে। ফলে পরিবেশ হয়ে উঠছে ভারসাম্যহীন এবং দেখা দিচ্ছে নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
৫। গ্রিন হাউজ প্রভাব
কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ক্রমাগত জমা হওয়ার ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে, যা ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও খরার মতো দুর্যোগকে তীব্রতর করছে।
৬। জলবায়ু পরিবর্তন
বাংলাদেশ একটি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এর ফলে অতিবৃষ্টি, খরা, ঘূর্ণিঝড়, অনিয়মিত মৌসুম ইত্যাদি দুর্যোগ ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
৭। বন উজাড় ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস
অবৈধভাবে বনভূমি দখল, বৃক্ষ নিধন ও বন উজাড়ের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন খরা, অতিবৃষ্টি, ভূমিধস ইত্যাদির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের ধ্বংস ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট করে দিচ্ছে
৮। ভূমিকম্পের ঝুঁকি বৃদ্ধি:
অপরিকল্পিত নগরায়ন, দুর্বল ভবন নির্মাণ ইত্যাদি কারণে বড় ভূমিকম্প হলে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদহানির সম্ভাবনা রয়েছে।
৯। নদী ভাঙন
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় নদী ভাঙন একটি বড় দুর্যোগ। প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
১০। অপরিকল্পিত নগরায়ন
অপরিকল্পিতভাবে শহর সম্প্রসারণের ফলে জলাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস ইত্যাদি কারণে দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১১। দারিদ্র্য ও সামাজিক অসচেতনতা
দারিদ্র্যের কারণে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করতে বাধ্য হয় এবং দুর্যোগ মোকাবেলার বিষয়ে সচেতনতার অভাব দেখা যায়।
১২। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা
দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি, উদ্ধার ব্যবস্থা ও পুনর্বাসনের দুর্বলতার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়।
১৩. উন্নয়ন প্রকল্পের অসামঞ্জস্যতা
অনেক উন্নয়ন প্রকল্প প্রকৃত পরিবেশগত প্রভাবগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে বাস্তবায়ন করা হয়। যেমন, নদী শাসন, বাঁধ নির্মাণ, বনভূমি ধ্বংস করা ইত্যাদি প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে পরিকল্পনা না করা হলে তা পরবর্তীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি করতে পারে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প বিভিন্ন প্রাকৃতিক অবকাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট করে এবং তা দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
১৪. বিশ্বব্যাপী গ্লোবালাইজেশন এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক
বিশ্বব্যাপী গ্লোবালাইজেশন এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নানা ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে। যেমন, খরা, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, এবং বন্যার মতো ঘটনা দেশে আরও বেশি ঘটছে, যা শুধুমাত্র স্থানীয় প্রভাব নয়, বৈশ্বিক পরিবেশের পরিবর্তনও এর জন্য দায়ী।
১৫. বিশ্ব বাজারের পরিবর্তন এবং কৃষির উপর প্রভাব
বিশ্ব বাজারে কৃষিপণ্যের দাম ওঠানামা এবং তার প্রভাব বাংলাদেশের কৃষি সেক্টরে দুর্যোগ সৃষ্টি করতে পারে। একদিকে যেখানে বাংলাদেশের কৃষির উপর অতি নির্ভরশীলতা রয়েছে, অন্যদিকে বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা বা কৃষি উৎপাদনে বিনিয়োগের অভাব বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলছে, যার ফলে খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
১৬. অতিরিক্ত বর্জ্য নিষ্কাশন
অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না হওয়া এবং অতিরিক্ত বর্জ্য পরিবেশে ফেলা, বিশেষ করে প্লাস্টিকের বর্জ্য, নদী ও সাগরে ফেলা বাংলাদেশে নানা ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। এটি জলাশয়ের সংকোচন, পানি দূষণ, সাগর ও নদীতে মাছের প্রজাতির ধ্বংস এবং বন্যার মতো বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
১৭. জলাশয়ের অবৈধ দখল
বিভিন্ন জায়গায় জলাশয়, পুকুর বা খাল দখল করার ফলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিস্থিতিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, যা বন্যা এবং পানি সংক্রান্ত অন্যান্য দুর্যোগের কারণ হতে পারে। নদী ও জলাশয় দখল করে নির্মাণ কাজ করা দেশের বিপর্যয় মোকাবেলায় বাধা সৃষ্টি করছে এবং জলাবদ্ধতা ও বন্যা আরো বাড়ছে।
১৮. বন্যপ্রাণী এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যের অবনতি
বন্যপ্রাণী এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানের অবনতি, বিশেষ করে গাছপালা, জলাশয় ও বনভূমির অবৈধ শিকার এবং নিধন, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এতে করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ভূমিধস, অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি আরও বাড়ে।
১৯. অপ্রচলিত কৃষি প্রযুক্তি ও কৌশল
অনেক সময় কৃষকদের পুরনো প্রযুক্তি এবং কৌশলের উপর নির্ভরশীলতা দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা হ্রাস করে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে কৃষকদের কাজের ধারা পরিবর্তন হচ্ছে, যা দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
২০. উপকূলীয় অঞ্চল ও সমুদ্র স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সমুদ্র স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা প্রায়শই মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি করছে।
২১. আন্তর্জাতিক সাহায্য ও সংস্থাগুলোর অপ্রতুলতা
কখনও কখনও আন্তর্জাতিক সাহায্য ও সংস্থাগুলোর সাহায্য যথাসময়ে পাওয়া যায় না, এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সিস্টেমগুলো দুর্বল থাকে, যা দুর্ঘটনাপ্রবণ অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। দুর্যোগে কার্যকরী এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সঠিক সহায়তা এবং পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২২. প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার
অপ্রতিরোধ্যভাবে প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার এবং সেগুলোর অবাধ শোষণ যেমন—মাটি, পানি, বায়ু, বনভূমি—এগুলো সকলের জন্য বিপদজনক। যখন এসব সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহৃত না হয়, তখন তা পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি করে।
উপসংহার: বাংলাদেশে দুর্যোগের সৃষ্টি অনেক কারণে হতে পারে, যেগুলোর বেশিরভাগই মানবসৃষ্ট বা পরিবেশগত। উপরিউক্ত কারণ ছাড়াও আরো নানাবিধ কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দেয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে চাপ বাড়ছে, একদিকে প্রযুক্তির উন্নতি এবং অপরদিকে কৃষি, বনাঞ্চল ও পানির ব্যবহার ঠিকভাবে না হওয়ায় বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। তবে এসব সমস্যার সমাধানে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে দুর্যোগের প্রভাব কমানো সম্ভব। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জন্য এমন এক পরিস্থিতি যা মোকাবেলা করা অস্বাভাবিক যার ফলে মানুষ হয়ে যায় সম্বলহীন ও অসহায়।
