জর্জ হার্বাড মিডের প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবাদ ও অহমবোধ সংজ্ঞা
ভূমিকা:- "সামাজিক মনোবিজ্ঞান ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর হলো প্রতীকী মিথস্ক্রিয়া (Symbolic Interactionism) এবং অহমবোধ (The Self)। সমাজে মানুষের আচরণ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং আত্মচেতনার বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যায় এই ধারণাগুলো অপরিহার্য। প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবাদ মূলত এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি, যা সমাজকে একটি বিমূর্ত কাঠামো হিসেবে না দেখে বরং মানুষের প্রতিদিনের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বা মূর্ত আচরণের ফসল হিসেবে দেখে।
এই প্রত্যয়টির বিকাশে প্রখ্যাত চিন্তাবিদ জর্জ হার্বার্ট মিড এবং তাঁর উত্তরসূরী হার্বার্ট ব্লুমার-এর অবদান অনস্বীকার্য। মিডের মতে, মানুষ কেবল পরিবেশের ওপর প্রতিক্রিয়া দেখায় না, বরং প্রতীকের (যেমন: ভাষা বা অঙ্গভঙ্গি) মাধ্যমে নিজের সত্তা তৈরি করে। আজকের পোস্টে হার্বার্ট মিডের প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবাদ এবং তাঁর জগদ্বিখ্যাত অহমবোধের সংজ্ঞা ও গঠন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
প্রতীকী মিথস্কিয়ার সংজ্ঞা:
সাধারণভাবে বলা যায় যে প্রতীকী মিথস্ক্রিয়া হচ্ছে সমাজস্থ মানুষের কার্যকরণ সম্পর্ক। আর এই কার্যকরণ সম্পর্ক যখন ভাষা কিংবা প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় তথন তাকে প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবাদ বলে।
প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবাদ প্রামাণ্য সংজ্ঞা:
B. Sushmar তাঁর Dictionary of sociology (1987) গ্রন্থে বলেন ''প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবাদ হলো মানুষের সামাজিক জীবনের যোগাযোগ এবং আন্তঃক্রিয়ার বৈশিষ্ট্যের একটি আদর্শ রুপ যা ভাষা কিংবা প্রতীকধর্মী ইশারা ইঙ্গিতের সাথে জড়িত।''
F. Abraham তাঁর 'Modern Sociological Theories' গ্রন্থে বলেন ''প্রতীকী মিথস্ক্রিয়ার প্রকৃতি সামাজিক কর্মকান্ডে এবং সামাজিক সম্পর্কের গতিময় রুপের উপর আলোচনা করে।''
প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবাদ মূলত জর্জ হার্বার্ট মিড এবং তার শিষ্য হারবার্ট ব্লুমার কর্তৃক প্রচলিত হয়। এ তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো, মানুষের কাজকর্মের ব্যাখ্যা শুধুমাত্র বাহ্যিক আচরণ দিয়ে নয়, বরং তার অন্তর্নিহিত প্রতীক ও মানে বিশ্লেষণ করে বোঝা উচিত। প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবাদ হলো এমন কিছু কাজ যা মানুষ আন্তঃযোগাযোগ বা অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করে। সমাজবিজ্ঞানীরা এটা ব্যবহার করে বিভিন্ন গবেষণাকার্য সম্পূর্ণ করে থাকেন।
অহঃবোধ বা অহমবোধ সংজ্ঞা
মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয় হলো অহঃবোধ। কিন্তু বর্তমানে সমাজবিজ্ঞানেও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এর আলোচনা করা হয়। কেননা এর মাধ্যমে ব্যক্তির আচরণ এবং সামাজিক আচরণ তথা সামষ্টিক আচরণ নির্ধারণ করা হয়। সাধারণ কথায় ব্যক্তি যা জানে বা বলে থাকে তাকেই অহঃবোধ বলে।
অহমবোধ:
(Self-awareness বা Self-concept) হলো ব্যক্তির নিজের সম্পর্কে ধারণা—সে কে, কেমন, তার সমাজে কী ভূমিকা। এটি মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলেও সমাজবিজ্ঞানে এটি সামাজিক সম্পর্ক, ভূমিকা ও পরিচয় বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্ব পায়। সাধারণভাবে অহমবোধ এমন এক চেতনা বোঝায়, যার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেকে উপলব্ধি করে এবং নিজের পরিচয় সম্পর্কে ধারণা গড়ে তোলে।
অহমবোধ/ অহঃবোধ প্রামাণ্য সংজ্ঞা:
জর্জ হার্বার্ট মিড এর মতে ''অহঃবোধ হচ্ছে এমন একটি ফলাফল যা অন্য লোকের সম্পর্কের দ্বারা সৃষ্টি।''
জনসনের মতে 'অহম হচ্ছে এক প্রকার অভ্যন্তরীণ বিষয় যা মানুষের ব্যক্তিত্বকে প্রভাবিত করে।'
চার্লস হরটন কুলী বলেন 'সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যক্তির বিশিষ্ট ভূমিকার অহঃবোধ প্রভাবিত হয়। অর্থাৎ অন্যান্য মানুষের সাথে আদান প্রদানের মাধ্যমে বক্তির মধ্যে নিজের সম্পর্কে যে ধারণার উদ্ভব হয় তাই অহঃবোধ।
অর্থাৎ, আমরা আমাদের সম্পর্কে যেমন ধারণা করি, তা অন্যরা আমাদের সম্পর্কে কীভাবে দেখে ও প্রতিক্রিয়া দেয় তার ওপর নির্ভর করে। সমাজে বসবাস করার ফলে ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই এই অহঃবোধ গড়ে ওঠে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, প্রতীকী মিথস্ক্রিয়া ও অহমবোধ দুটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ধারণা। মানুষের পারস্পরিক প্রতীকভিত্তিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তির আত্মচেতনা বা অহঃবোধ গড়ে ওঠে। একদিকে প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবাদ আমাদের শেখায় কীভাবে মানুষ অর্থবোধক প্রতীক ও ভাষার মাধ্যমে সামাজিক বাস্তবতা নির্মাণ করে, অন্যদিকে অহঃবোধ বুঝিয়ে দেয় সেই সমাজে ব্যক্তি নিজেকে কীভাবে দেখে এবং নিজ সম্পর্কে কীভাবে ধারণা তৈরি করে। এ দুই ধারণার বিশ্লেষণ সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য যেমন গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, তেমনি সাধারণ মানুষের আত্ম-উপলব্ধির জন্যও অপরিহার্য।
