এইডসের সংজ্ঞা ও বিস্তারের কারণসমূহ আলোচনা
ভূমিকা: AIDS একটি মারাত্মক নিরব ঘাতক ব্যাধি। এই রোগে কোন ব্যক্তি আক্রান্ত হলে সে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে পতিত হয়। বিশ্বে আজ ও কোন প্রকার এইডস এর ঔষধ আবিস্কার হয়নি। যার কারনে বর্তমানে মানুষেরা HIV/AIDS নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত। AIDS এক আশ্চার্য রুদ্ধশ্বাস লড়াই।
এইডস (AIDS):
ইংরেজি বর্ণমালার A.I.D.S নিয়ে গঠিত AIDS. AIDS এর পূর্ণরুপ Acquired Immune Deficiency Syndrome. যার বাংলা অর্জিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাব লক্ষণের সমষ্টি কে বোঝায় যা এমন একটি রোগ যাতে মস্তিস্কের ক্ষতিসাধন হয় এবং দেহের স্বাভাবিক কমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় ও নিস্তেজ হয়ে আসে। এইডস রোগটি নিজে নিজে আসে না।এটি বহুলাংশে মানুষ নিজেই ডেকে আনে। এইডস এ আক্রান্ত ব্যক্তি ছত্রাক, ব্যকটেরিয়া, প্রটোজোয়া ইত্যাদি অন্যান্য ভাইরাস থেকেও রক্ষা পায় না। এইডস এর জন্য HIV ভাইরাস দায়ী। HIV (Human Immune Deficiency Virus) এর প্রাণঘাতী অবস্থাকেই (AIDS) এইডস বলে। বাহির থেকে এ ভাইরাস প্রবেশ করার সাথে সাথে প্রকাশ পায় না। এতে প্রায় ৭/৮ বছর সময় লেগে যায়। Syndrome হলো যখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেতে পেতে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় তাকে (AIDS) এইডস বলে।
এইডস বিস্তারের মাধ্যমসমূহ
(AIDS) এর বিস্তারের কারণসমূহ: নিম্নে এইডস রোগের বিস্তৃতির মাধ্যমগুলি উল্লেখ করা হলো।
১। অরক্ষিত যৌন মিলন
এইচআইভি আক্রান্ত পুরুষ বা নারীর সাথে অরক্ষিত যৌন মিলনের ফলে এইডস বেশি ছড়িয়ে থাকে। এচাড়া অবাধে যৌন আচরণ, অনিয়ন্ত্রিত যৌন কার্যক্রম, যৌন মিলনে অসতর্কতা AIDS রোগের বিস্তৃতির কারণ। Varginal ও Oral উভয় ধরনের যৌন মিলনের মাধ্যমে HIV/AIDS রোগ বৃদ্ধি পাবার সম্ভবনা থাকে।
২। রক্তের মাধ্যমে
AIDS এ আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করলে রক্তের মাধ্যমে এইডস হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি যেমন- সুঁচ, সিরিঞ্জ, ব্লেড, খুর ইত্যাদি ব্যবহারের দ্বারা ও এইডস ছড়িয়ে থাকে। এইডস রোগে আক্রান্ত রোগীর রক্ত গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। রক্ত গ্রহণের আগে পরীক্ষা করে নিতে হবে।
৩। আক্রান্ত মায়ের দ্বারা
AIDS রোগে আক্রান্ত মহিলা গর্ভধারণ করলে তার সন্তানের মধ্যে এ রোগ ছড়াতে পারে। জন্মের পর মায়ের দুগ্ধপানের মাধ্যমে শিশুর HIV/AIDS হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত ও রক্তজাত সামগ্রী শরীরে গ্রহণের দ্বারা এইডস রোগ ছড়ায়।
৪। মাদকাসক্তদের ইনজেকশন ভাগাভাগি করে ব্যবহারের মাধ্যমে
ড্রাগ বা ইনজেকশন ব্যবহারে যদি একই সূঁচ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করে, তবে HIV ভাইরাস সহজেই একজন থেকে আরেকজনের শরীরে প্রবেশ করে।
৫। অন্যান্য কারণ
নগরায়ন, শহরায়ন, ভ্রাম্যমাণ শ্রমিক, জানবহন শ্রিমক, দরিদ্র্য মানুষ AIDS রোগের জন্য বেশি ঝুকিপূর্ণ। কেননা তারা তাদের জীবনমান সম্পর্কে তেমন সচেতন থাকে না। পতিতাবৃত্তি এইডস রোগ ছড়ানের অন্যতম একটি কারণ। পতিতাদের মধ্যে এইচআইভি বা এইডস রোগের সম্ভবনা বেশি থাকে কারণ পতিতারা বিভিন্ন মানুষের সাথে সঙ্গমে মিলিত হয়। এদের মধ্য ড্রাগ ব্যবহারের প্রবণতাও বেশি লক্ষ্য করা যায় যা HIV/AIDS রোগ ছড়ানোতে সহায়ক।
৬। অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন
যেসব দেশে রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা দুর্বল বা অবহেলাজনিত কারণে রক্ত পরীক্ষা ছাড়া রক্ত সঞ্চালন করা হয়, সেখানে HIV/AIDS দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে দুর্ঘটনা বা জরুরি অবস্থায় অপরীক্ষিত রক্ত গ্রহণ করলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৭। অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতির মাধ্যমে
অস্ত্রোপচার, দাঁতের চিকিৎসা, ডেলিভারি বা অন্যান্য চিকিৎসা কার্যক্রমে যদি জীবাণুমুক্ত (Sterilized) যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা হয়, তবে HIV ভাইরাস ছড়াতে পারে।
৮। যৌনবাহিত অন্যান্য রোগ (STD)
গনোরিয়া, সিফিলিস, চ্যানক্রয়েড ইত্যাদি যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে ক্ষত সৃষ্টি হয়, যা HIV ভাইরাসের প্রবেশ সহজ করে দেয়। ফলে এইডস হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
৯। সচেতনতার অভাব ও অজ্ঞতা
এইডস সম্পর্কে ভুল ধারণা, কুসংস্কার, লজ্জা ও সামাজিক ভয়ের কারণে মানুষ পরীক্ষা বা চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হয় না, ফলে রোগটি নীরবে ছড়িয়ে পড়ে।
১০। বিদেশগামী শ্রমিক ও প্রবাস জীবন
দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকা, অনিরাপদ যৌন আচরণ ও সচেতনতার অভাবের কারণে প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে HIV সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
উপসংহার: এইডস একটি ভয়াবহ কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক জ্ঞান, সচেতনতা, নিরাপদ যৌন আচরণ, জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের মাধ্যমে এইডসের বিস্তার রোধ করা সম্ভব।
