পরিবারের কার্যাবলি লিখ ? একক ও যৌথ পরিবারের পার্থক্য লিখ?
পরিবারের কার্যাবলিসমূহ আলোচনা এবং একক ও যৌথ পরিবারের পার্থক্য
ভূমিকা:- পরিবার সমাজ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক প্রতিষ্ঠান। পরিবার এমন সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলি সম্পাদন করে যা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের দ্বারা সম্ভব না।
পরিবারের কার্যাবলিসমূহ
পরিবারের বিভিন্ন কার্যাবলি বিদ্যমান। নিম্নে কয়েকটি বিশেষ কার্যাবলি আলোচনা করা হলো।
১। জৈবিক কাজ
পরিবারের প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর জৈবিক সম্পর্ক বজায় রাখা ও সন্তান-সন্ততি জন্মদান এবং লালনপালন করা। মানব শিশু পরিবারে জম্মগ্রহণ করে ও পরিবারেই লালিত-পালিত হয়ে বড় হয় এবং পরিবারেই মৃত্যুবরণ করে তাই পরিবারকে 'চিরন্তর মাতৃসদন' বলা হয়।
২। শিক্ষামূলক কাজ
পরিবারকে বলা হয় শাশ্বত বিদ্যালয়।কেননা পরিবার অতীতকাল থেকেই মানব শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত। মানব শিশু জম্মের পর হতেই পরিবার থেকে সামাজিক নিয়মনীতি, আচার-আচরণ, আদব-কায়দা, শিষ্টাচার, ধর্মীয় শিক্ষা ইত্যাদি শিখে থাকে।
৩। অর্থনৈতিক কাজ
আদিম সমাজে অর্থনৈতিক কার্যাবলির মূল কেন্দ্রিক ছিলো পরিবার।বর্তমানে কৃষি ভিত্তিক সমাজে ফসল উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বন্টন ব্যবস্থা পরিবারের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়।এমন কি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের কাজগুলো বর্তমানে পরিবার সম্পন্ন করে থাকে কিন্তু আধুনিককালে নগরায়ন শিল্পায়ন ও নব্য প্রযুক্তির প্রসারের ফলে পরিবারের অর্থনৈতিক কার্যাবলি হ্রাস পাচ্ছে।
৪। ধর্মীয় কাজ
সর্বপ্রথম পরিবার থেকেই একজন শিশু ধর্মীয় শিক্ষা পেয়ে থাকে।ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে সদস্যদের মনে সৃষ্টকর্তা, ইহকাল-পরকাল, পাপ-পূণ্য, সত্য-মিথ্যা ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। ফলে স্রষ্টার প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধরের সৃষ্টি হয়।
৫। অবকাশমূলক কাজ
পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে অবকাশমূলক কার্যাবলি কাজের অবসরে পরিবার তার সদস্যদের নিয়ে খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদ, গল্প-গুজব ইত্যাদি বিনোদনমূলক কার্যাবলি সম্পন্ন করে থাকে।
৬। সামাজিকীকরণ
পরিবার একটি শিশুকে সমাজের নিয়ম-কানুন, রীতিনীতি, মূল্যবোধ ও আচার-আচরণ শেখায়। শিশুর ভাষা, সংস্কৃতি, আচরণ ও পরিচয় গঠনে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়াই সামাজিকীকরণ।
৭। মানসিক ও আবেগিক সহায়তা
পরিবার তার সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা, সহানুভূতি, স্নেহ ও আবেগিক নিরাপত্তা প্রদান করে। বিপদের সময় পরিবার সদস্যদের পাশে দাঁড়ায় এবং মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস জোগায়।
একক ও যৌথ পরিবারের পার্থক্যসমূহ
একক ও যৌথ পরিবারের পার্থক্য: একক ও যৌথ পরিবারের পার্থক্য নিচে আলোচনা করা হলো।
১। এক স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যে পরিবার গঠিত তাই একক পরিবার। অপরদিকে, যে পরিবারে স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, ভাইবোন ও বাবা-মা একত্রে বসবাস করে তাই যৌথ পরিবার বলে।
২। একক পরিবার আকৃতিতে অনেক ছোট। যৌথ পরিবার আকৃতিতে অপেক্ষাকৃত বড়।
৩। একক পরিবারের সদস্য সংখ্যা কম অপরদিকে যৌথ পরিবারের সদস্য সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
৪। শহরের সমাজব্যবস্থায় একক পরিবার বেশি লক্ষ্য করা যায়। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজে যৌথ পরিবারের প্রাধান্য বিদ্যমান।
৫। একক পরিবারের আয়-ব্যয় স্বামী-স্ত্রীর মতামতের ভিত্তিতে হয় অন্যদিকে যৌথ পরিবারের আয়-ব্যয় হিসাব পরিবারের বায়োজোষ্ঠ কর্তার মতামতে হয়।
৬। একক পরিবারের জীবন যাত্রা সহজ-সরল অপরদিকে যৌথ পরিবারের জীবন-যাত্রা অনেকটা জটিল ও কঠিন।
৭। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ফলে একক পরিবারের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে শিল্পায়ন, নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে যৌথ পরিবার দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
৮। একক পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর হাতে থাকে। যৌথ পরিবারে পরিবারের প্রবীণ বা বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
৯। একক পরিবারে সদস্যরা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বেশি ভোগ করে। যৌথ পরিবারে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
১০। একক পরিবারে পারিবারিক সম্পর্ক অপেক্ষাকৃত দুর্বল হতে পারে। যৌথ পরিবারে আত্মীয়তার বন্ধন ও পারস্পরিক নির্ভরতা বেশি দৃঢ় হয়।
১১। একক পরিবারে শিশু লালন-পালনের দায়িত্ব মূলত বাবা-মায়ের উপর নির্ভরশীল। যৌথ পরিবারে দাদা-দাদি, চাচা-চাচি সহ অন্যান্য সদস্য শিশুর লালন-পালনে সহযোগিতা করে।
১২। একক পরিবারে বয়স্কদের দেখাশোনা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। যৌথ পরিবারে বয়স্ক সদস্যদের যত্ন ও নিরাপত্তা তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে নিশ্চিত হয়।
১৩। একক পরিবারে আয়ের উৎস সীমিত হওয়ায় অর্থনৈতিক ঝুঁকি বেশি থাকে। যৌথ পরিবারে একাধিক উপার্জনকারী থাকায় আর্থিক নিরাপত্তা বেশি হয়।
১৪। একক পরিবারে পারিবারিক দ্বন্দ্ব তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। যৌথ পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বের সম্ভাবনা বেশি থাকে।
১৫। একক পরিবারে খরচ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও নিয়ন্ত্রিত হয়। যৌথ পরিবারে সম্পদের যৌথ ব্যবহার হয় এবং খরচ ভাগাভাগি করা হয়।
১৬। একক পরিবারে পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ তুলনামূলক কম হয়। যৌথ পরিবারে পারিবারিক রীতি-নীতি, সংস্কার ও ঐতিহ্য বেশি সংরক্ষিত থাকে।
উপসংহার: একক ও যৌথ পরিবার উভয়েরই নিজস্ব সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে। সমাজ ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবার ব্যবস্থার ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। তবে সুস্থ সমাজ গঠনে উভয় পরিবার ব্যবস্থারই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

Comments
Post a Comment