সমাজতন্ত্র কী? সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর

সমাজতন্ত্র (Socialism) কী? সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ

ভূমিকা:- সমাজতন্ত্র হলো এমন একটি আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা যেখানে সম্পদের রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা পরিচালিত হয় সমাজের সাধারণ কল্যাণে। সমাজতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সাম্যবাদী নীতি, যা সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে একটি ন্যায়বিচার ভিত্তিক সমাজ গড়তে চায়। অনেকে সমাজতন্ত্রকে গণতন্ত্রের একটি উন্নত বা মানবিক রূপ হিসেবেও বিবেচনা করেন, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে সমষ্টিগত স্বার্থকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের লেখনীর মাধ্যমে এই আদর্শ বিশ্বজুড়ে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। আজকে আমরা সমাজতন্ত্রের সংজ্ঞা এবং সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

সমাজতন্ত্র কী? সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ

সমাজতন্ত্র (Socialism) সংজ্ঞা

সমাজতন্ত্র হচ্ছে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদনের যন্ত্র উপাদান সম্পদ সবকিছু রাষ্ট্রে কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সে সম্পদ সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করে দেবে। সম্পদের কোনো ব্যক্তি মালিকানা থাকবে না। থাকবে না কোন শ্রেণি বৈষম্য।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা

সমাজতন্ত্র বিষয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন নিম্নে কয়েকজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর দেওয়া সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো-

লেনিন এর মতে- “সমাজতান্ত্রিক সমাজ বলতে বোঝায় সেই সমাজ যেখানে পুজিপতিদের সাহায্য ছাড়াই কার্য নির্বাহ হয়। শ্রমজীবীদের সবচেয়ে অগ্রগামী অংশ যেখানে সর্বস্ব কিছুর হিসাব রাখে, নিয়ন্ত্রণ রাখে ও তদারক করে।”

এঙ্গেলস বলেছেন যে, সমাজতন্ত্রের অর্থ হচ্ছে যে প্রয়োজনের রাজ্য থেকে স্বাধীনতার রাজ্যে মানুষের উত্তরণ।”

সমাজতন্ত্র হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদনের উপকরণগুলো সমাজের হাতে অর্পিত থাকে।

সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা

সমাজতন্ত্র এমন একটি মতবাদ যেখানে শ্রেণিবৈষম্য, শোষণ, অত্যাচার থাকবে না। সমাজতন্ত্র হলো দুর্নীতিমুক্ত একটি নীতি। নিম্নে সমাজতন্ত্রের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১। শোষণহীন সমাজ

সমাজতান্ত্রিক ব্যবসায় সমাজ হবে শোষণহীন, অত্যাচারহীন, বঞ্চিতহীন, শ্রেণিবৈষম্যহীন।

২। সামাজিক মালিকানা

সমাজতন্ত্র সমাজ ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপকরণ ও সম্পদের মালিক হবে সমাজ।কিন্তু ব্যক্তিগত কোন মালিকানা থাকবে না।

৩। শ্রেণি বৈষম্যহীন:

সমাজতন্ত্র সমাজ ব্যবস্থায় উঁচু-নিচু কোন ধরনের শ্রেণি ভেদাভেদ থাকবে না কারণ সমাজ থেকে শোষণ বঞ্চনা দূর করতে হবে। বৈষম্য নির্মূল সমাজ গঠন করাই সমাজতন্ত্রের মূল লক্ষ্য।

৪। ন্যয়বিচার:

সমাজতন্ত্রে থাকবে নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা। শাসক নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার করবে।

৫। সাম্যবাদনীতি:

সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সাম্যবাদনীতি। মূলত শোষণ থেকে জনগণকে রক্ষার জন্য সমাজতন্ত্র সমাজে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। সাম্যবাদনীতি ছাড়া সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

৬। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের প্রাধান্য:

সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সবকিছুতেই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সমাজতন্ত্রে জনগণকে দাস হিসেবে পরিচালিত করার চেষ্টা করা হয়। রাষ্ট্রের কোন ব্যক্তি বা কোন প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে বদলাতে পারে না।

৭। নির্বাচন ব্যবস্থা:

সমাজতন্ত্র হলো এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে নির্বাচন ব্যবস্থার অস্তিত্ব রয়েছে। সমাজতন্ত্রে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয় যা নির্দিষ্ট সময় পর পর একটি নির্বাচনের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

৮। সমবায় ভিত্তিক অর্থনীতি:

সমাজতন্ত্রে সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়, যাতে সবার অংশগ্রহণ ও সমান সুযোগ থাকে।

৯। দারিদ্র্য বিমোচন:

সমাজতন্ত্র দারিদ্র্য দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। সকলের মৌলিক চাহিদা যেমন- খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি নিশ্চিত করা হয়।

১০। সামাজিক নিরাপত্তা:

সমাজতন্ত্রে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা থাকে। এটি একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল সমাজ গঠনে সহায়ক।

উপসংহার: সমাজতন্ত্র হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে সমাজ ব্যবস্থায় ধনী গরিব নির্বিশেষে সবাই সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারে ও সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। সমাজতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা।

অঅরও পড়ুন- সমাজতন্ত্র সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে বিস্তারিত।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন