পরিবেশ কী? what is environment? পরিবেশের উপাদানসমূহ লিখ

পরিবেশ কী? পরিবেশের উপাদানসমূহ লিখ

ভূমিকা:- সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে সামাজিক সম্পর্কের বিজ্ঞান। সমাজবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় ও পরিধি ব্যাপক এ বিস্তৃত। পরিবেশ হচ্ছে এর মধ্যে অন্যতম একটি। পরিবেশ নিয়ে সমাজবিজ্ঞানের আলাদা একটি শাখা শুরু হয়েছে পরিবেশ সমাজবিজ্ঞান নামে। এটি পরিবেশকে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করে।

পরিবেশের সংজ্ঞা ও পরিবেশের উপাদানসমূহ

পরিবেশের সংজ্ঞা

পরিবেশের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো 'Environment' এ শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ Viron থেকে যার অর্থ একটি বৃত্ত বা দেশ। শব্দগত অর্থে পরিবেশ সমগ্র পৃথিবীকে এর অন্তভূক্ত করে।

সাধারণত পরিবেশ বলতে আমরা যেখানে বসবাস করি তার পারিপাশ্বিক অবস্থার যোগফলকে বুঝায়। এটি ক্ষুদ্রতম থেকে ক্ষুদ্র কোষ থেকে শুরু করে সমগ্র মানবসমাজ ও জীবজগৎকে এর অন্তভূর্ক্ত করে। তাই এর সংজ্ঞা দেয়া কঠিন। পরিবেশ ধারণাটি বেশ ব্যাপক ও জটিল। পরিবেশ তার আলোচনায় সকল জীব ও জড় জগৎকে একত্রিত করে।

পরিবেশের প্রামাণ্য সংজ্ঞা

বিভিন্ন মনীষীগণ পরিবেশকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিম্নে পরিবেশের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো।

Cambridge Dictionaries অনুসারে Environment is the air, water and land in or on which people animals and plants live. (অর্থাৎ বাতাস পানি এবং জমিঅথবা যার উপর মানুষ প্রাণী ও গাছপালা বেঁচে থাকে তাই পরিবেশ)

পল ব্রুকসের মতে Well never understand the natural environment until we do not see it was a living entity. অর্থাৎ আমরা কখনই প্রাকৃতিক পরিবেশকে বুঝতে পারবো না যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এটিকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে না দেখি।

স্নেইবার্গের মতে পরিবেশ প্রাকৃতিক এবং জাতীমন্ডলীয় অবকাঠামোকে অন্তভূক্ত করে।

ম্যাকাইভার ও পেইজের মতে, ভৌগোলিক পরিবেশ হলো প্রকৃতি মানুষের জন্য যেসব পরিবেশ প্রদান করে, তার সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর পৃষ্ঠতল, তার সমস্ত ভৌত বৈশিষ্ট্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, ভূমি ও জল, পর্বত ও উদ্ভিদ, খনিজ পদার্থ, উদ্ভিদ, প্রাণীর বন্টন। জলবায়ু এবং সমস্ত মহাজাগতিক শক্তি, মহাকর্ষীয় শক্তি, বৈদ্যুতিক শক্তি, ঐতিহ্যবাহী শক্তি যা পৃথিবীর উপর প্রভাব ফেলে এবং মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। সুতরাং বলা যায় পরিবেশ হলো বিভিন্ন অবস্থান সমূহের সমষ্টি যেখানে সজীব উপাদানসমূহ ও অজীব উপাদানসমূহের পারস্পারিক ক্রিয়াশীলতা বিদ্যমান থাকে।

পরিশেষে বলা যায় যে, পরিবেশ হচ্ছে জড় ও জৈব উপাদান যা আমাদের জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। তার উপর নির্ভর করেই আমরা বেচে থাকি। তবে বর্তমানে পরিবেশের ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। যার প্রভাব সরাসরি মানবজীবনের উপর পড়ছে

পরিবেশের উপাদানসমূহ:-

পরিবেশের উপাদান বলতে সেই সমস্ত বিষয় বা উপাদানকে বোঝায়, যেগুলো আমাদের চারপাশ ঘিরে রেখেছে এবং জীবের জীবনধারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে। সাধারণভাবে, পরিবেশের উপাদানসমূহকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়:

১. প্রাকৃতিক উপাদান (Natural Components)

প্রাকৃতিক উপাদানগুলো সৃষ্টির সাথে সাথেই পৃথিবীতে উপস্থিত এবং এগুলো জীবের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। এই উপাদানগুলি দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়: জৈব উপাদান এবং অজৈব উপাদান।

ক. জৈব উপাদান (Biotic Components)

জৈব উপাদান এমন সব প্রাণী বা জীবিত বস্তু যা আমাদের পরিবেশে রয়েছে এবং জীবের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই উপাদানগুলো জীবজগতের সঙ্গে সম্পর্কিত, কারণ এসবের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রাণী, উদ্ভিদ এবং অণুজীবের অস্তিত্ব নির্ভর করে। প্রধান জৈব উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে:

মানুষ:- মানুষ পরিবেশের অন্যতম প্রধান উপাদান। আমরা শুধু পরিবেশের সঙ্গে একে অপরকে সংযুক্ত করি না, বরং আমাদের আচরণ, সিদ্ধান্ত, এবং কার্যকলাপ পরিবেশের উপাদানগুলোকে প্রভাবিত করে।

উদ্ভিদ:- উদ্ভিদগুলো জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা অক্সিজেন তৈরি করে, খাদ্য সরবরাহ করে এবং পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সাহায্য করে।

প্রাণী:- প্রাণীরা উদ্ভিদের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং খাদ্য চক্রের অংশ হিসেবে পরিবেশের একটি অপরিহার্য উপাদান। প্রাণীজগতের মধ্যে সৃষ্ট খাদ্য শৃঙ্খল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।

অণুজীব:- ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল ইত্যাদি অণুজীবগুলো পৃথিবীর সর্বত্র উপস্থিত এবং তারা পরিবেশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। তারা মাটি, জল ও বায়ুর পরিচ্ছন্নতা এবং জীবাশ্ম পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মাছ:- নদী, সাগর ও জলাশয়ে বসবাসকারী মাছ প্রাণীজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলো খাদ্য শৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।

পোকামাকড়:- পোকামাকড় যেমন মৌমাছি, প্রজাপতি, এবং পিঁপড়া জীববৈচিত্র্যের অপরিহার্য উপাদান। তারা পরাগায়ন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে এবং মাটির উন্নতিতে ভূমিকা রাখে।

খ. অজৈব উপাদান (Abiotic Components)

অজৈব উপাদানগুলি এমন সব অজীব উপাদান যা জীবের জন্য পরিবেশ তৈরি করে এবং তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করে। এই উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে:

মাটি:- মাটি পৃথিবীজুড়ে সৃষ্ট জীবনের জন্য অপরিহার্য উপাদান। এটি উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য পরিবেশ তৈরি করে, পানি ধারণ করে এবং প্রাণীদের বাসস্থান সরবরাহ করে।

পানি:- পানি জীবনের অপরিহার্য উপাদান। এটি জীবের শারীরিক ক্রিয়াকলাপ, খাদ্য প্রক্রিয়া এবং পরিবেশের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

বায়ু:- বায়ু গ্যাসীয় উপাদান, যা জীবনের জন্য অক্সিজেন এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড সরবরাহ করে। এছাড়াও, বায়ু বিভিন্ন পরিবেশগত প্রক্রিয়া, যেমন বৃষ্টি, ঠান্ডা বা গরম বাতাস, শক্তি সঞ্চালন ইত্যাদি প্রভাবিত করে।

আলো:- সূর্যালোক পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য এবং জীবনের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য অপরিহার্য। উদ্ভিদ কণা (ফটোসিন্থেসিস) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আলো গ্রহণ করে এবং জীবজগতের খাদ্য শৃঙ্খল শুরু হয়।

তাপমাত্রা:- পৃথিবীর তাপমাত্রা বিভিন্ন জীবের স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য উপযুক্ত। এটি প্রাকৃতিক পরিবেশের সঠিক পরিবেশ তৈরি করে এবং পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

খনিজ পদার্থ:- মাটির খনিজ পদার্থ যেমন লোহা, সিলিকন, ক্যালসিয়াম, কপার, ইত্যাদি প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য পুষ্টি সরবরাহ করে। এই পদার্থগুলি জীবনের জন্য অপরিহার্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।

বাতাসের চাপ:- বাতাসের চাপ পরিবেশের নানা প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, যেমন বৃষ্টিপাত, বাতাসের গতিবিধি, এবং জলবায়ু পরিবর্তন। এটি পৃথিবীর জলবায়ু সিস্টেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

মৌসুমি পরিবর্তন:- পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুমের পরিবর্তন, যেমন শীতকাল, গ্রীষ্মকাল, বর্ষাকাল, এসব পরিবেশের অজৈব উপাদান। এই মৌসুমিক পরিবর্তনগুলো জীববৈচিত্র্য এবং কৃষিকাজের উপরও গভীর প্রভাব ফেলে।

২. মানবসৃষ্ট উপাদান (Man-made or Anthropogenic Components)

মানবজাতি অনেকগুলি উপাদান তৈরি করেছে, যা পরিবেশকে প্রভাবিত করে। এগুলো প্রাকৃতিক উপাদানগুলির পরিবর্তে তৈরি হয় এবং পরিবেশের উপর সরাসরি বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলে। মানবসৃষ্ট উপাদানগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:

ঘরবাড়ি:- শহর বা গ্রামের বসবাসযোগ্য স্থাপনা, যেমন বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট ইত্যাদি, যা পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে। এই ঘরবাড়ি নির্মাণের ফলে ভূমির ব্যবহার পরিবর্তিত হয় এবং প্রাকৃতিক বাসস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যানবাহন:- গাড়ি, ট্রাক, বাস, এবং অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থা পরিবেশে উল্লেখযোগ্য দূষণ সৃষ্টি করে, যেমন বায়ু দূষণ, শব্দদূষণ এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন।

কলকারখানা:- কলকারখানাগুলি প্রচুর পরিমাণে দূষণ সৃষ্টি করে এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব কলকারখানার কারণে মাটি, পানি, বায়ু এবং পরিবেশের অন্যান্য উপাদানগুলোর দূষণ হয়।

বিদ্যুৎ, শব্দ ও অন্যান্য দূষণ:- মানবজাতির উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া পরিবেশের বিভিন্ন দিক যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন, শব্দ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। এ সব দূষণ আমাদের স্বাস্থ্য এবং জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্জ্য:- প্লাস্টিক, কাচ, ধাতু ও অন্যান্য অ-বায়োডিগ্রেডেবল বর্জ্য পরিবেশের জন্য এক বড় হুমকি। এগুলো মাটির ক্ষতিকর উপাদান হয়ে পরিবেশ দূষিত করে এবং জীববৈচিত্র্যকে বিপন্ন করে।

বিল্ডিং ও শিল্পনগরী:- শহর ও শিল্পনগরীর গঠন পরিবেশের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এসব স্থাপনার জন্য বনভূমি কেটে ফেলা, মাটির অবক্ষয়, বায়ু দূষণ এবং জলাধারের দূষণ ঘটে।

উপসংহার: পরিবেশের উপাদানসমূহ একে অপরের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে সম্পর্কযুক্ত।এ সকল জীবজগৎ ও অজীবজগৎ প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে বলেই আমাদের বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে ওঠে। পরিবেশ রক্ষায় এসব উপাদানের সঠিক ব্যবহার ও সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।

Comments

Popular posts from this blog

রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর

টার্ম পেপার (term paper) কী? টার্ম পেপার লেখার নিয়ম অনার্স-মাস্টার্স

রাজনৈতিক যোগাযোগ কী? রাজনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্ব